আব্দুল কাদের, নিজস্ব প্রতিবেদক:: কিছু মানুষের চলে যাওয়া কেবল একটি জীবনের অবসান নয়, তা একটি সময়ের, একটি অধ্যায়ের, অসংখ্য স্মৃতি ও ভালোবাসার নীরব বিদায়। মানুষটি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন, কিন্তু তাঁর কর্ম, আদর্শ, লেখনী এবং মানুষের হৃদয়ে রেখে যাওয়া ভালোবাসা তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে যুগের পর যুগ। তেমনই একজন মানুষ ছিলেন টঙ্গীর সাংবাদিকতা অঙ্গনের পরিচিত মুখ, দৈনিক জনকণ্ঠের সাবেক সহসম্পাদক, সাপ্তাহিক অগ্নিসাক্ষীর প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক এবং ঐতিহ্যবাহী টঙ্গী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মরহুম শাহজাহান সিরাজ সাজু।
আজ তাঁর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। সময়ের হিসাবে তিনটি বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন, তাঁর স্নেহ পেয়েছেন কিংবা তাঁর লেখনীর সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন, তাঁদের স্মৃতিতে তিনি আজও জীবন্ত। বিশেষ করে সাংবাদিকতার সহকর্মী ও অনুজদের কাছে তিনি কেবল একজন পেশাজীবী ছিলেন না, ছিলেন এক পরিচিত মুখ, প্রিয় ভাই এবং সাংবাদিকতার পথচলার এক স্মরণীয় মানুষ।
জাতীয় সংবাদপত্র থেকে স্থানীয় সাংবাদিকতা ছিল বহুমাত্রিক পথচলা:
শাহজাহান সিরাজ সাজু দৈনিক দিনকাল, দৈনিক জনকণ্ঠসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে দায়িত্ব পালন করেছেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি দৈনিক জনকণ্ঠের সহসম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি নিজের সম্পাদনা ও প্রকাশনায় সাপ্তাহিক অগ্নিসাক্ষী পত্রিকার দায়িত্বও পালন করেছেন আমৃত্যু।
এই দুটি পরিচয় তাঁর কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। একদিকে জাতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় বিভাগে দায়িত্ব পালন, অন্যদিকে নিজস্ব প্রকাশনার মাধ্যমে সংবাদ ও মতামত প্রকাশের উদ্যোগ দুটিই ছিল তাঁর সাংবাদিকতার পরিসরের অংশ।
সাংবাদিকতা শুধু সংবাদ সংগ্রহ কিংবা সংবাদ প্রকাশের নাম নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দায়িত্ববোধ, তথ্য যাচাই, জনস্বার্থ এবং সত্যকে তুলে ধরার অঙ্গীকার। একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয়ও শেষ পর্যন্ত তাঁর কাজের মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়। শাহজাহান সিরাজ সাজুর কর্মজীবন স্মরণ করতে গেলে তাঁর সংবাদপত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং সম্পাদনার দায়িত্বকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হয়।
টঙ্গী প্রেসক্লাবের নেতৃত্বে রেখে গেছেন স্মৃতি:
টঙ্গী প্রেসক্লাবের ইতিহাস ও স্থানীয় সাংবাদিকতার পরিসরে শাহজাহান সিরাজ সাজুর নাম বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। তিনি এই ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তাঁর নেতৃত্বের সময়কাল ও সহকর্মীদের সঙ্গে পথচলা স্থানীয় সাংবাদিক মহলের স্মৃতির অংশ হয়ে রয়েছে।
একটি সাংবাদিক সংগঠন কেবল সদস্যদের মিলনস্থল নয়, এটি পেশাগত অধিকার, পারস্পরিক সহযোগিতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের ঐক্য রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সেই সংগঠনের নেতৃত্বে যাঁরা দায়িত্ব পালন করেন, তাঁদের কাজ ও স্মৃতি পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকে।
সাপ্তাহিক অগ্নিসাক্ষী তাঁর কর্মপরিচয়ের আরেক অধ্যায়:
শাহজাহান সিরাজ সাজুর নামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে সাপ্তাহিক অগ্নিসাক্ষী। পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে তিনি আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
একটি পত্রিকা পরিচালনা করা শুধু সংবাদ ছাপানোর বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে সংবাদ নির্বাচন, সম্পাদনা, প্রকাশনা, পাঠকের কাছে পৌঁছানো এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যে প্রকাশনার ধারাবাহিকতা রক্ষার চেষ্টা। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে একটি সংবাদপত্রের অস্তিত্ব ধরে রাখা দায়িত্ব ও অধ্যবসায়ের কাজ।
অগ্নিসাক্ষীর মাধ্যমে তিনি যে পেশাগত পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন, তা তাঁর কর্মজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। তাঁর মৃত্যুর পর এই নাম উচ্চারিত হলে তাই শুধু একটি পত্রিকার কথা নয়, এর সঙ্গে মনে পড়ে যায় একজন সম্পাদকের শ্রম, দায়িত্ব এবং সাংবাদিকতার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততার কথা।
অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই, তারপর চিরবিদায়:
শাহজাহান সিরাজ সাজু ৫১ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তিনি দীর্ঘদিন মায়োপ্যাথি রোগে ভুগছিলেন। ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে রাজধানীর উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মরদেহ চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ইসলামাবাদ গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
একজন কর্মব্যস্ত সাংবাদিকের জীবনের শেষ অধ্যায় এভাবেই নেমে এসেছিল নীরবতায়। যে মানুষ সংবাদ, সম্পাদনা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁর অনুপস্থিতি তৈরি করেছিল এক ব্যক্তিগত শূন্যতা বিশেষ করে পরিবার, স্বজন ও সহকর্মীদের জীবনে। মৃত্যুর সংবাদে সহকর্মীদের হাসপাতালে ছুটে যাওয়া এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংবাদিক সংগঠনের নেতাদের শোক প্রকাশের বিবরণ সেই শোকেরই সাক্ষ্য বহন করে।
স্মৃতির মূল্য শুধু আবেগে নয়, কর্মের মূল্যায়নেও:
মৃত্যুবার্ষিকীতে কাউকে স্মরণ করার অর্থ কেবল তাঁর জন্য শোক প্রকাশ করা নয় তাঁর জীবন, কাজ ও অবদানকে নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করাও জরুরি। একজন সাংবাদিকের ক্ষেত্রে এই মূল্যায়নের অন্যতম ভিত্তি তাঁর প্রকাশিত কাজ, পেশাগত দায়িত্ব, সংগঠনে ভূমিকা এবং সহকর্মীদের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক।
শাহজাহান সিরাজ সাজুর জীবন থেকে নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকেরা কয়েকটি বিষয় নিয়ে ভাবতে পারেন পেশাগত দায়িত্বের গুরুত্ব, সম্পাদনার কাজের মর্যাদা, নিজস্ব প্রকাশনা টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা এবং সাংবাদিক সংগঠনে অংশগ্রহণের তাৎপর্য।
তাঁকে যথার্থ সম্মান জানাতে হলে তাঁর অবদান তুলে ধরার পাশাপাশি যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে চিনতেন,জানতেন, সেই সমস্ত মানুষ ও সাংবাদিকদের তথা তাঁদের স্মৃতিচারণও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন ও কর্মের আরও পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা সম্ভব হবে।
মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক পদ-পদবি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। শ্রদ্ধা, স্নেহ, আন্তরিকতা ও স্মৃতির বন্ধনই সেসব সম্পর্ককে গভীর করে তোলে। একজন প্রিয় ভাইয়ের অনুপস্থিতি তাই শুধু একটি নাম হারিয়ে ফেলা নয়, কখনো তা পুরোনো দিনের কথা, একসঙ্গে কাটানো মুহূর্ত এবং পরিচিত কণ্ঠস্বরের জন্য নীরব হাহাকার।
শাহজাহান সিরাজ সাজুকে স্মরণ করার এই দিনে তাঁর সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও স্বজনদের স্মৃতিচারণ নতুন করে সামনে আসুক। তাঁর জীবনের অজানা অধ্যায়, পেশাগত অভিজ্ঞতা, প্রকাশিত লেখা এবং সাংবাদিকতা অঙ্গনে তাঁর সঙ্গে পথচলা মানুষের সাক্ষ্য সংরক্ষিত হোক। কারণ, স্মৃতি সংরক্ষণ করা মানে শুধু অতীতকে আঁকড়ে থাকা নয়; ভবিষ্যতের জন্য ইতিহাসের উপাদান রেখে যাওয়া। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত দৈনিক জনকণ্ঠ, সাপ্তাহিক অগ্নিসাক্ষী এবং টঙ্গী প্রেসক্লাবের স্মৃতি তাঁকে বারবার মনে করিয়ে দেবে।
মানুষের জীবন একদিন থেমে যায়, কিন্তু তাঁর কর্মের গল্প থেমে থাকতে হয় না। সেই গল্পগুলো যত্ন করে সংরক্ষণ করা গেলে আগামী দিনের সাংবাদিকেরা জানতে পারবেন তাঁদের আগে এই পথেও কেউ হেঁটেছেন, দায়িত্ব পালন করেছেন, সহকর্মীদের সঙ্গে স্বপ্ন ভাগ করেছেন।
প্রিয় শাহজাহান সিরাজ সাজু ভাই , আপনার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। মহান আল্লাহ আপনার জীবনের সব ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন, কবরকে প্রশস্ত ও নূরান্বিত করুন এবং আপনাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন। আপনার শোকসন্তপ্ত পরিবার, স্বজন, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি রইল আন্তরিক সমবেদনা।