October 21, 2026, 9:24 pm

গাজীপুরে অবৈধভাবে কৃষিজমি ও জলাশয় ভরাটের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের অভিযান

Reporter Name
  • আপডেট Wednesday, October 21, 2026
  • 15 জন দেখেছে

শেখ কামরুল হাসান সাহাঃ গাজীপুর মহানগরীতে অবৈধভাবে কৃষিজমি ও জলাশয় ভরাটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে জেলা প্রশাসন। সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে বারবার নিষেধ করার পরও বালু দিয়ে কৃষিজমি ও জলাশয় ভরাটের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগে অভিযান চালিয়ে একটি ড্রেজার মেশিন অকেজো করে ধ্বংস করা হয়েছে। একই সঙ্গে বালু ভরাটের কাজে ব্যবহৃত অপর একটি প্রকল্পের ড্রেজার পাইপ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বালু নদীতে ড্রেজার স্থাপন করে পাইপলাইনের মাধ্যমে বালু এনে কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট করা হচ্ছিল। এতে কৃষিজমির শ্রেণি ও পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। একাধিকবার নিষেধ করা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভরাট কার্যক্রম অব্যাহত রাখায় শেষ পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করা হয়।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের উজিরপুর এলাকায় বালু নদীতে এ অভিযান পরিচালিত হয়। জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় পরিচালিত এ অভিযানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও ভরাটের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বারবার নিষেধের পরও চলছিল ভরাট কার্যক্রম
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত ৯ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে পরিদর্শনকালে পূবাইল ভূমি অফিসের আওতাধীন ১০২ নম্বর পূবাইল মৌজার আরএস ২৮৫ নম্বর খতিয়ানভুক্ত আরএস ১২০৫ নম্বর দাগের বোরো শ্রেণির জমিতে অবৈধভাবে বালু ফেলে ভরাট করার চিত্র দেখতে পান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জমিটি বর্তমানে পানিতে নিমজ্জিত উন্মুক্ত জলাশয় হিসেবে রয়েছে। সেখানে বালু ফেলে ভরাটের কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল। বিষয়টি নজরে আসার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভরাট কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে রাতের অন্ধকারে এবং সরকারি অফিস বন্ধ থাকার সময়েও পুনরায় বালু ভরাটের কাজ চালানো হয়। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর গত ১০ সেপ্টেম্বর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত প্রতিবেদন পাঠানো হয়।
এরপর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে অবৈধ ভরাট বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয় জেলা প্রশাসন।
‘মাইলস্টোন’ প্রতিষ্ঠানের ড্রেজার মেশিন ধ্বংস
গাজীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজ্জাত হোসেন জানান, কৃষিজমি ও জলাশয় অবৈধভাবে ভরাটের অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট তহশিলদারদের ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছিল। তাঁদের মাধ্যমে ভরাট কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশও দেওয়া হয়। কিন্তু সেই নির্দেশ অমান্য করে কাজ অব্যাহত রাখার অভিযোগ পাওয়া যায়।
তিনি জানান, পরিস্থিতি বিবেচনায় জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নুরুল করিম ভূঞার নির্দেশে অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযানে নেতৃত্ব দেন গাজীপুর সদর উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার জিয়াউল হাসান সৌরভ। তিনি জানান, জেলা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই ‘মাইলস্টোন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান বালু নদীতে ড্রেজার স্থাপন করে পাইপলাইনের মাধ্যমে বালু এনে কৃষিজমি ও জলাশয় ভরাট করছিল বলে প্রশাসনের নজরে আসে।
রোববার সন্ধ্যায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের উপস্থিতি টের পেয়ে ড্রেজারের মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। পরে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে অবৈধ কাজে ব্যবহৃত ড্রেজার মেশিনটি অকেজো করে ধ্বংস করা হয়।
এ ছাড়া সুমন চৌধুরী নামে অপর এক ব্যক্তির বালু ভরাট প্রকল্পে ব্যবহৃত ড্রেজার পাইপও ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে অবৈধভাবে কৃষিজমি ও জলাশয় ভরাটের কার্যক্রম বন্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে।
কৃষিজমি ও জলাশয় রক্ষায় কঠোর প্রশাসন
গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. শাহরিয়ার নজির জানান, জেলা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া জলাশয় ভরাট কিংবা আবাসন প্রকল্পের নামে প্রাকৃতিক জলাধার বিনষ্ট করার যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, সরকারি অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার চেষ্টা করলে তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। কৃষিজমি ও জলাশয় রক্ষায় প্রশাসন নিয়মিত নজরদারি চালাচ্ছে। অবৈধভাবে বালু ভরাটের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে।
তিনি আরও জানান, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, কৃষিজমি সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক জলাধারকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষায় জেলা প্রশাসন বদ্ধপরিকর। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পরিবেশ ও কৃষিজমি রক্ষায় নজরদারি জোরদারের দাবি
স্থানীয় পর্যায়ে কৃষিজমি ও জলাশয় ভরাটের মতো কর্মকাণ্ড দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং কৃষির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট হলে বর্ষা মৌসুমে পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের স্বাভাবিক ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ কারণে কৃষিজমি ও জলাশয়ের প্রকৃত শ্রেণি সংরক্ষণ, অনুমোদনহীন বালু ভরাট বন্ধ এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিয়মিত তদারকি জোরদার করা জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল। পাশাপাশি সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে যারা এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।
গাজীপুর জেলা প্রশাসনের এ অভিযান অবৈধভাবে কৃষিজমি ও জলাশয় ভরাট বন্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর আইন প্রয়োগ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযানকালে বেঞ্চ সহকারী বদরুজ্জামান ইমন ও আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন।

সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই সম্পর্কিত আরও খবর