নিজস্ব প্রতিবেদক:: ফেনীর আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের রায় আজ সোমবার (২৪ আগস্ট) ঘোষণা করবেন হাইকোর্ট। রায়কে কেন্দ্র করে যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সোনাগাজী উপজেলায় নুসরাতের বাড়িতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
সোনাগাজী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসিম জানান, নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আগে নুসরাতের বাড়িতে দুজন পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকলেও বর্তমানে আরও সাত অতিরিক্ত সদস্য সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন। এলাকায় পুলিশের টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানান তিনি।
সুবিচারের প্রত্যাশা ও শঙ্কার কথা জানিয়ে নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা চাই আদালতের দেওয়া সাজা বহাল থাকুক। আসামিরা যেন আইনের কোনো ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেতে না পারে, এটাই আমাদের একমাত্র দাবি। বাড়িতে বাড়তি নিরাপত্তার জন্য আমরা সন্তুষ্ট। তবে কাজের প্রয়োজনে বাইরে বের হতে হলে শঙ্কা থেকে যায়।’
এর আগে, বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কেএম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শেষ হয়। পরে আদালত ২৪ আগস্ট রায়ের দিন ধার্য করেন।
নারী ও শিশু নির্যাতন আইনসংক্রান্ত ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও বিবিধ বিষয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য গত ১০ জুন প্রধান বিচারপতি এই বিশেষ বেঞ্চ গঠন করেন। বেঞ্চটি ১৪ জুন থেকে কার্যক্রম শুরু করে। নুসরাত হত্যা মামলার শুনানি শুরু হয় ২৮ জুলাই। মামলাটির ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের ওপর মোট ১৭ কার্যদিবস শুনানি হয়েছে।
২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে নুসরাতের মা শিরীন আখতার মামলা করেন। ওই মামলায় অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে মামলা তুলে নিতে নুসরাতের ওপর চাপ দেওয়া হলেও তিনি রাজি হননি। এরপর ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে নুসরাতকে পরিকল্পিতভাবে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে আগুন দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাকে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, পরে ফেনী জেনারেল হাসপাতাল এবং সেখান থেকে ঢাকায় নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে তদন্ত শেষে ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মামলার রায়ে ১৬ আসামির প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ড এবং এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেন।
মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার বরখাস্ত অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার তৎকালীন কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, মাদ্রাসাছাত্র নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মণি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।
পরে ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর নিয়ম অনুযায়ী আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের (ডেথ রেফারেন্স) জন্য নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয় এবং আসামিপক্ষও সাজার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল দায়ের করেন। আজ হাইকোর্টের রায়ে নিম্ন আদালতের ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকবে নাকি সাজায় কোনো পরিবর্তন আসবে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে নুসরাতের পরিবার।