July 24, 2026, 9:14 pm

গাজীপুরে ময়লার ভাগাড় থেকে কুড়িয়ে পাওয়া বর্জ্যেই চলছে অসহায় পরিবার জীবন-জীবিকা

মো: মুর্শিকুল আলম::
  • আপডেট Friday, July 24, 2026
  • 5 জন দেখেছে

মো: মুর্শিকুল আলম:: মানুষের ফেলে দেওয়া বর্জ্যই  অসহায় পরিবারের কাছে সম্পদ। যে ভাগাড়ের পাশ দিয়ে নাক চেপে দ্রুত চলে যান সাধারণ মানুষ, সেই দুর্গন্ধময় বর্জ্যের স্তূপেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভবিষ্যতের স্বপ্ন খোঁজেন সীমান্ত (৩০) ও তার ১২ বছরের ছেলে সুমন। প্লাস্টিক, লোহা, কাচ, কাগজ কিংবা বিক্রিযোগ্য বিভিন্ন ফেলে দেওয়া জিনিস কুড়িয়ে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে তিন সন্তানসহ পাঁচ সদস্যের সংসার। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৫ থেকে ২০টি পরিবার একই পেশার ওপর নির্ভরশীল। দুর্গন্ধ, বিষাক্ত বর্জ্য, সংক্রমণ ও ধারালো বস্তুর ঝুঁকি মাথায় নিয়েই প্রতিদিন তাদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের সামিট পাওয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্রসংলগ্ন ময়লার ভাগাড়ে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার পাশে একটি অটোভ্যান রেখে বাবা-ছেলে বর্জ্যের স্তূপে বিক্রিযোগ্য জিনিস খুঁজছেন। হাতে গ্লাভস নেই, পায়ে নিরাপত্তা জুতা নেই, মুখেও নেই কোনো মাস্ক। দুর্গন্ধ উপেক্ষা করে তারা প্লাস্টিক, লোহা, কাচ, কাগজসহ নানা ধরনের বর্জ্য সংগ্রহ করছেন। কিছু পাওয়া মাত্রই তা বস্তায় ভরে আবার খোঁজাখুঁজিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন।
ময়মনসিংহের নেত্রকোনার বাসিন্দা সীমান্ত বর্তমানে শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের মুলাইদ এমসি বাজার মাজম আলী মোড় এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন।

এ বিষয়ে সিমান্ত বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে এই কাজ করছেন। প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ছয় থেকে সাত ঘণ্টা বর্জ্য সংগ্রহ করেন। পরে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত ঝালমুড়ি বিক্রি করেন। কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস এমসি বাজারের একটি ভাঙারির দোকানে বিক্রি করে দৈনিক গড়ে প্রায় ৭০০ টাকার মালামাল বিক্রি হয়। মাসে আয় হয় প্রায় ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা। এই আয়েই চলে সংসার, ছোট মেয়ের পড়াশোনার খরচও মেটাতে হয়। তিন বছর আগে বিষাক্ত বর্জ্য ও সংক্রমণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে প্রায় এক সপ্তাহ বিছানায় ছিলাম। চিকিৎসার টাকাও জোগাড় করতে কষ্ট হয়েছে। কিন্তু পেটের দায়ে আবারও এই কাজেই ফিরতে হয়েছে।
একই পেশায় প্রায় ১২ বছর ধরে যুক্ত আরিফ (৩১) বলেন, অনেক সময় কলকারখানা ও বাসাবাড়ির ফেলে দেওয়া বর্জ্যের মধ্যে মূল্যবান জিনিসও পাওয়া যায়। তবে দুর্গন্ধ, বিষাক্ত গ্যাস, ধারালো কাচ ও লোহার কারণে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। ধারালো কাচে বা লোহায় পা কেটে গেলে শুকাতে অনেক সময় লাগে। হাতে গ্লাভস, পায়ে জুতা আর মুখে মাস্ক থাকলে অন্তত কিছুটা নিরাপদে কাজ করা যেত। উপজেলার বিভিন্ন ময়লার ভাগাড়ে প্রতিদিন আরও বহু মানুষ জীবিকার তাগিদে বর্জ্য সংগ্রহ করেন। কিন্তু তাদের জন্য নেই কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জাম, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা। মাওনা ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শামীম মৃধা বলেন, অনেক অসহায় পরিবার বর্জ্য সংগ্রহ করেই জীবিকা নির্বাহ করছে। তাদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া দরকার। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, খোলা জায়গায় অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ফেলে রাখার কারণে পরিবেশ দূষণের   পাশাপাশি বর্জ্য সংগ্রহকারীরা সংক্রমণ, শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ, বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শ এবং বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। তাদের জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সময়ের দাবি।

সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই সম্পর্কিত আরও খবর