নিজস্ব প্রতিবেদক:: অসুস্থ, আর্থিক সমস্যা, জমি বেদখল, এলাকার উন্নয়ন ইত্যাদি নানা সমস্যা নিয়ে বুধবার অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ গাজীপুরের জেলা প্রশাসকের সাথে দেখা করেন। তিনি ধৈর্য ধরে তাদের সবার কথা শুনে তাৎক্ষণিক সমাধান দেন। দুঃশ্চিন্তা নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে এসে তাদের প্রায় সবাই ফিরে গেছেন হাসিমুখে। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১৬নং ওয়ার্ডের দীঘিরচালা এলাকা থেকে পঙ্গু বাবার চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা চাইতে আসেন পোশাক শ্রমিক সানিয়া আক্তার (২৫)।
তিনি জেলা প্রশাসককে বলেন, তার বাবা মজিদ মিয়া লেগুনা চালক ছিলেন। তিনিই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ৬ বছর আগে দুর্ঘটনায় পা ভেঙে যায়। এখন পঙ্গু অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছেন। ১১ বছর আগে মারা গেছেন মা। ৮ম শ্রেণির ছাত্রী ছোট বোনের পড়ালেখা ও বাবার চিকিৎসার জন্য তাকে চাকরি নিতে হয়েছে। যে টাকা বেতন পান তা দিয়ে ঘর ভাড়া, সংসার খরচ, বোনের লেখাপড়ার খরচ দিতেই শেষ হয়ে যায়। টাকার অভাবে বাবার চিকিৎসা বন্ধ। তিনি খুব কষ্টে আছেন। সব শুনে জেলা প্রশাসক তাকে বাবার চিকিৎসার জন্য নগদ টাকা এবং ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা আশ্বাস দেন। টাকার অভাবে চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত টঙ্গীর অসহায় বৃদ্ধা সামসুন্নাহারের জন্যও নগদ অর্থ সহায়তা দেন জেলা প্রশাসক।
জেলা প্রশাসকের কাছে নিজের অসহায়ত্বে কথা তুলে ধরতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নগরীর ধীরাশ্রম থেকে একমাত্র মেয়েকে নিয়ে আসা বিধবা হালিমা আক্তার। জানান, ৪ মাস আগে স্বামী মারা গেছেন। ছেলে না থাকায় ভাসুরসহ অন্যরা মেয়েসহ তাকে স্বামীর সম্পদ থেকে বেওয়ারিশ করতে চাইছে। ঘরের সব জিনিসপত্র নিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। ১৩ বছরের কিশোরী মেয়েকে নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরেও বিচার পাচ্ছেন না। জেলা প্রশাসক সদর সার্কেলের এসিল্যান্ডকে দ্রুত সমাধানের দায়িত্ব দেন।
এভাবে, অধিগ্রহণ করা জমির বিল পেতে সমস্যা, মাতৃকালীন ভাতা, দুর্ঘনায় আহত হয়ে ক্ষতিপূরণ, এলাকার রাস্তার সমস্যা, অফিস স্থাপন, চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা, অগ্নিকাণ্ডে বাড়ি পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত, বাসস্থানের অভাব, কারখানার বকেয়া বেতনের টাকা আদায় ইত্যাদি নানা সমস্যা নিয়ে আসা অসহায় মানুষদের সমস্যার সমাধান দেন জেলা প্রশাসক।
জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে প্রতি বুধবার গুণশুনানি অর্থাৎ এলাকার সব ধরনের মানুষের কথা শোনা হয়। তারা নানা অভাব অভিযোগ সমস্যা নিয়ে আসেন। তাদের অনেকেই বয়স্ক এবং অসহায়। সন্তান থাকলেও খোঁজ নেয় না। আবার অনেকের কেউ নেই। সামর্থ্যও নেই। তাদের কষ্ট দেখলে-শুনলে মন খারাপ হয়। তার পক্ষে যেগুলো সম্ভব, সেগুলোর সমাধান করে দেন। বেশিরভাগ সমস্যাই থাকে জমিজমা, অর্থিক ও চিকিৎসা সংক্রান্ত। সরকারের নানা প্রোগ্রাম আছে। জটিল রোগের জন্য সমাজসেবা বিভাগ, গর্ভবতী মায়ের পুষ্টিকর খাবারের জন্য মহিলা ও শিশু বিভাগ ছাড়াও সরকারের প্রতিবন্ধী কল্যাণ ট্রাস্ট, বিআরটিএ, জেলা ত্রাণ বিভাগ থেকে অসহায় মানুষকে সাহায্যের সুযোগ রয়েছে। তিনি সরকারের এসব বিভাগ থেকে অসহায় মানুষকে সহায়তা পেতে সাহায্য করে চলেছেন।’
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘শুধু সমস্যা নয় সামাজিক কাজেও মানুষ আসে। যেমন একটি ইউনিয়নে ভূমি অফিস নেই, একজন সাবেক শিক্ষক এসেছেন তিনি ওই ইউনিয়নে একটি ইউনিয়ন ভূমি অফিস স্থাপন করার জন্য আবেদন করেছেন। কোনো কোনো মানুষ আসেন যে তার ওই এলাকায় জরিপ বন্ধ আছে, সেটাকে যাতে আমরা চালু করে দেই সরকারের সাথে কথা বলে, সেটার জন্যে আসেন। হাসপাতাল করা লাগবে, রাস্তা করা লাগবে এজন্য তারা আবেদন নিয়ে আসেন, এরকম সামাজিক কাজেও আসেন। এখানে সারাদিন যদি আমরা শুনি, দেখবেন এই সমাজের একটা পূর্ণাঙ্গ চিত্র বুঝা যায়। মানুষের অভাব, অভিযোগ, অনুযোগ এসব কিছু বুঝা যায়। কেউ কেউ যে সত্যি সত্যি খুব কষ্টে আছে, তার সেই কষ্টের জায়গাগুলোকে আমরা কীভাবে লাগব করতে পারি সেজন্য কাজ করি।’
তিনি বলেন, আমাদের যে সরকার, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে সরকার দেশ পরিচালনা করছে, সেই সরকারের উদ্দেশ্য একটাই একটি মানবিক বাংলাদেশ, সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ যাতে তার অধিকারটা বুঝে পায় সেরকম একটা সবার জন্য বাংলাদেশ, সকলের জন্য বাংলাদেশ এবং মানবিক বাংলাদেশ-সেটাই করার চেষ্টা করছি আমরা।
জেলা প্রশাসক বলেন, আজকে পঞ্চাশের অধিক মানুষকে আমরা শুনেছি, সবাই কিন্তু অনুদানের জন্য আসেননি, যারা অনুদানের জন্য এসেছে, অনুদান দেওয়ার মানদণ্ডের ভিত্তিতে বেশকিছু মানুষকে আমরা অনুদান দিয়েছি। আবার কাউকে আমরা হাসপাতালে রেফার করেছি, আবার কাউকে ভূমি জটিলতা, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে কাজ, থানায় কাজ, শিল্প পুলিশের কাছে কাজ- এসকল জায়গায় আমরা রেফার করে দিয়েছি, কানেক্ট করে দিয়েছি-এটাই আমাদের কাজ। সঠিক ম্যানেজমেন্ট হলেই মানুষ এই সেবাগুলো পাবে। প্রতিদিন মানুষ আসে, প্রতিদিন মানুষগুলোর চেহারার দিকে যখন তাকাই তখন মনে হয় যেন এই লোকটার জন্য কিছু করা দরকার।’