বিনোদন ডেস্ক :: জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী নাজমুন মুনিরা ন্যান্সি জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তার মা ছিলেন নেত্রকোনা জেলা জাসাসের সহসভাপতি। এ কারণে ১৬ বছর নানাভাবে বঞ্চিত ছিলেন তিনি। অনেক অনুষ্ঠানে তাকে গান গাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। গত রোববার এই গায়িকা ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে বিগত সরকারের আমলে তার ওপর অন্যায় আচরণের কথা তুলে ধরেছেন।
তিনি লেখেন, “২০১১ সালে প্রজাপতি সিনেমার ‘দুদিকেই বসবাস’ গানটির জন্য আমি সেরা নারী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে মনোনীত হই এবং পুরস্কার দেওয়া হয় ২০১৩ সালের মার্চ মাসে। আমার বড় মেয়ের অসুস্থতার কারণে আমি পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারিনি, পরে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে আমার পুরস্কারটি সংগ্রহ করি। ২০১৩ সালের শেষে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আমি ফেসবুকে ছোট্ট একটি লেখা লিখি, যার সারমর্ম ছিল— শুধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য যারা আওয়ামী লীগ সমর্থন করেন; তাদের সময় এখন ফিরে আসার। সে সময় বিগত জালিম সরকারের সমালোচনা অনেকেই করেছিল (তখনো কিছুটা স্বাধীনতা অবশিষ্ট ছিল)। কিন্তু রাতারাতি বারুদের মতো আমার লেখনী সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।”
ফলাফলÑ ফেসবুক পোস্টের এক দিন পরই মধ্যরাতে আমার নেত্রকোনার বাড়ি ঘেরাও হয়। আমার মা আমৃত্যু নেত্রকোনা জেলা জাসাসের সহসভাপতি ছিলেন (২০১২ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন)। অথচ পুলিশ ফোর্স জানাল তাদের কাছে গোপন সূত্রে খবর আছে আমার বাসা নাকি জামাত-শিবির জঙ্গির আস্তানা! তারা বাড়ি তল্লাশি করবে। আমি অসম্মতি জানালে এসএসসি পরীক্ষার্থী আমার ছোট ভাইকে তারা তুলে নিয়ে যেতে চাইল। আমার সঙ্গে অনেক বাগবিতণ্ডার পর তারা চলে গেল। বাধ্য হয়ে আমি প্রেস কনফারেন্স করলাম। আমি মিথ্যা মামলা থেকে বাঁচলাম কিন্তু হয়রানি বন্ধ হলো না। হয়রানির তালিকা লম্বা, অনেকেই নিশ্চয়ই জানেন। যারা জানেন না তারা আমার কমেন্ট বক্সে গিয়ে বাংলাভিশনের ইন্টারভিউ দেখে নেবেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ন্যান্সি র জীবন কীভাবে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে, এ প্রসঙ্গে এ গায়িকা তার ফেসবুকে লেখেন, ‘২০১৪ সালে অবৈধভাবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সমর্থক আমার জীবন দুর্বিষহ হয়ে গেল। তত দিনে চেনা মুখগুলো অচেনা হতে শুরু করল। আওয়ামী সমর্থকদের তখন জোর দাবি— শেখ হাসিনাকে নিয়ে কটূকথা বলা এই আমাকে কেন জাতীয় পুরস্কার দেওয়া হলো? অথচ আমি একটি রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করেছিলাম মাত্র! ওদের ভাব এমন যেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্তি আমার অর্জন নয় কিংবা বাংলাদেশ সরকার এই সম্মাননা দেয়নি, স্বয়ং শেখ হাসিনা বুঝি ভিক্ষা দিয়েছেন!’
গানের শো বাতিল হওয়া নিয়ে এ গায়িকা লেখেন, ‘২০১৪ সাল থেকে একের পর এক স্টেজ শো বাতিল হতে থাকল। সিনেমার গান— সে তো স্বপ্ন! আমার প্রায় ৩০ লাখ ফলোয়ারের ফেসবুক পেজ গায়েব হয়ে গেল, যেন আমার কথা মানুষের কাছে না পৌঁছায়! আমার জানামতে, ২০১৪ সালে শিল্পীদের মধ্যে ফেসবুকে অর্গানিকভাবে সবচেয়ে বেশি ফ্যান-ফলোয়ার ছিল আমার। এমনকি নতুন করে যে ফেসবুক আইডি খুলতাম, সেটাই কিছুদিন পর লাপাত্তা হয়ে যেত!’
মানসিক চাপে অস্থির হয়ে ঠিকমতো ঘুমাতে পারতেন না ন্যান্নি। তিনি তার স্ট্যাটাসে বলেন, ‘২০১৪ সালে আর্থিক, মানসিক, সামাজিক, কর্মক্ষেত্রে হেয়প্রতিপন্ন ২৬ বছর বয়সি আমি ভয়ংকর রূপে সাইবার বুলিংয়ের শিকার। বিধ্বস্ত অবস্থায় ঘর-সংসার সব ফেলে নেত্রকোনা চলে গেলাম। ঘুম নেই, খাওয়া নেই, প্রতিদিন পুলিশ ভ্যান বিকাল থেকে বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে আর আমি বাসার ছাদে পায়চারি করি। আর নিতে না পেরে ঘুমের ওষুধ খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলাম। শেখ হাসিনার মব বাহিনীর সে কি কুৎসিত উল্লাস!’
নতুন করে লড়াই শুরু করেন ন্যান্নি। সে প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, ‘মন শক্ত করলাম। নিজেকে বোঝালাম, আমি একজন যোদ্ধা। কাজ খোঁজা শুরু করলাম। বেশিরভাগ জায়গায় অলিখিত ব্ল্যাক লিস্টেড। শোয়ের সংখ্যা তলানিতে। সে সময় বেশ কিছু গান নিয়ে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করল স্নেহাশিস ঘোষ। শুরু হলো সিডি চয়েসের ব্যানারে আমার একের পর এক গান মুক্তি পাওয়া।’
টেলিভিশনের গান গাওয়া প্রসঙ্গে ন্যান্নি বলেন, ‘টিভি চ্যানেলগুলোয় কদাচিৎ ডাক পেতাম। সেটাও সম্ভব হতো যেসব প্রোগ্রাম প্রডিউসার আমার গান ভালোবাসতেন, তাদের বদৌলতে। তবে একটি টিভি চ্যানেল পুরোটুকু সময় আমার উপস্থিতি পর্দায় চলমান রেখেছেÑ চ্যানেলটির নাম বাংলাভিশন। এমনকি আমার আপন দুই ভাই বাংলাভিশনে কর্মরত।’
সব শেষে ন্যান্সি লেখেন, ‘প্লে-ব্যাক সিঙ্গার হিসেবে আমি বিগত ১১ বছরে ১১টি গান সিনেমার জন্য গেয়েছি বলে মনে পড়ে না। ফিল্মে আমার সব জনপ্রিয় গান ২০১৪ সাল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। সে কারণেই আমার আর কখনোই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া হয়নি। আমি জোর কণ্ঠে বলতে পারি, হাসিনা বাহিনীর রোষানলে পড়া ব্ল্যাক লিস্টেড আমি টিকে ছিলাম এবং টিকে আছি আমার মনোবল ও ভক্ত-শ্রোতাদের ভালোবাসায়।’