নিজস্ব প্রতিবেদক:: গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের হাজতি রাজা বাদশা ওরফে পিচ্চি রাজা (৩৪) প্রিজন ভ্যান থেকে পালানোর ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটন করেছে গাজীপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। প্রাথমিকভাবে গাজীপুরের বাইমাইল এলাকায় প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যাওয়ার যে তথ্য দেওয়া হয়েছিল, তদন্তে তার সঙ্গে গরমিল পাওয়া গেছে। ডিবির তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, পিচ্চি রাজা মূলত ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকা থেকে অপেক্ষমাণ একটি প্রাইভেটকারে করে পালিয়ে যান। পরে বাইমাইলে এসে পালানোর ঘটনা সাজানো হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। আজ সোমবার গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে এসব তথ্য জানান গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশ কমিশনার মোঃ ইসরাইল হাওলাদার। তিনি জানান, ঘটনার শুরুতে যে তথ্য পাওয়া গিয়েছিল, তদন্তে তার সঙ্গে অসঙ্গতি ধরা পড়ার পর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান চালানো হয়। ধারাবাহিক তদন্তে সাক্ষ্য, তথ্য-উপাত্ত ও বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে ঘটনার প্রকৃত চিত্র বের করে আনার চেষ্টা করছে ডিবি।
পুলিশ কমিশনার বলেন, পিচ্চি রাজার পলায়নের ঘটনায় দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত করা হয়েছে। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে পলাতক আসামি পিচ্চি রাজাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকা জেলা জজ আদালত থেকে ২৯ জন আসামিকে স্কট করে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ফেরত নেওয়ার পথে গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী থানাধীন বাইমাইল সেতুর প্রায় ১০০ গজ পশ্চিমে পিচ্চি রাজা পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগে কোনাবাড়ী থানায় দণ্ডবিধির ২২৪ ধারায় মামলা করা হয়। পরে ২৯ সেপ্টেম্বর মামলাটির তদন্তভার জিএমপি ডিবি দক্ষিণ বিভাগে অর্পণ করা হয়।
মামলাটি তদন্ত করছেন ডিবি দক্ষিণ বিভাগের ইন্সপেক্টর সৈয়দ মিজানুর ইসলাম। তদন্তে সহায়তা করছেন এসি ডিবি আছাবুর রহমান, এসি জোসেফ মঞ্জুর চৌধুরী, ইন্সপেক্টর নাহিদ হাসান সুমনসহ ডিবির একটি বিশেষ টিম।
তদন্তে বিভিন্ন সাক্ষীর বক্তব্য, আলামত ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা দেখতে পান, এজাহারে বর্ণিত ঘটনাস্থল ও ঘটনার বিবরণের সঙ্গে বাস্তব ঘটনার মিল নেই।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা জেলা জজ আদালত থেকে ২৯ জন আসামিকে নিয়ে প্রিজন ভ্যানটি কাশিমপুরের উদ্দেশে ফেরার পথে ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকার পুপলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাছে থামে। সেখানে স্কট পার্টির ইনচার্জ এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেনের কাছ থেকে ভ্যানের চাবি নেন। এরপর পিচ্চি রাজা ও হাজতি আসামি খাইরুল বাশারকে ভ্যান থেকে বের করে সামনের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। একপর্যায়ে খাইরুল বাশার প্রিজন ভ্যানের চালকের আসনের পাশে বসেন। তবে পিচ্চি রাজা ও এসআই প্রবীর কুমার ভ্যানে ওঠেননি। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় অপেক্ষমাণ একটি প্রাইভেটকারে করে পিচ্চি রাজা সেখান থেকে পালিয়ে যান।
পরে এসআই প্রবীর কুমার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাইমাইলের কথিত ঘটনাস্থলে এসে প্রিজন ভ্যানে ওঠেন এবং স্কট পার্টির সদস্যদের নিয়ে এজাহারে বর্ণিত পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা সাজানো হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস, প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেন এবং পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে পাওয়া তথ্য যাচাই করে ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় এর আগে দায়িত্বে থাকা পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল এবং তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে তাদের বক্তব্যের মধ্যেও অসঙ্গতি পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশ কমিশনার মোঃ ইসরাইল হাওলাদার বলেন, পুলিশের দায়িত্ব হলো সত্য ঘটনা উদঘাটন করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। এ ঘটনায় কোনো ধরনের গাফিলতি বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে পলাতক আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের আইনের আওতায় আনতে ডিবির তদন্ত দলকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, পিচ্চি রাজাকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য ব্যক্তি ও পলাতক আসামির অবস্থান শনাক্তে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তদন্তে নতুন কোনো তথ্য বা সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।