নিজস্ব প্রতিবেদক:: গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গীতে মাদক ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের মাঝে বাড়ছে আতঙ্ক। এইসব অপরাধীদের নির্মুল করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা প্রতিনিয়তই অভিযান চালাচ্ছেন। অপরদিকে অপরাধীরা পুলিশ প্রশাসনকে পাশ কাটিয়ে বিভিন্ন অপরাধ কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিপুলসংখ্যক আসামিকে গ্রেফতার করলেও বন্ধ হচ্ছে না মাদক কারবার ও ছিনতাইয়ের ঘটনা। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরে টঙ্গীর পূর্ব ও পশ্চিম থানায় মাদক ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় প্রায় ৪০২টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৯৫৬ জনকে।
স্থানীয়রা জানান, মহানগরীরর বিভিন্ন বস্তি, রেললাইন, শিল্পকারখানার আশপাশ এলাকার অলিগলিতে মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজসহ নানা অপরাধ কর্মকান্ড চলছে। এছাড়াও মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের আধিপত্যকে টিকিয়ে রাখতে অস্ত্র ব্যবহার করে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।
পুলিশ জানায়, গত ৯ মাসে দুই থানায় মাদক ও ছিনতাইয়ের ৪০২ মামলায় ৯৫৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে টঙ্গী পূর্ব থানায় জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডাকাতি ও ছিনতাই সংক্রান্ত ৫৬টি মামলা হয়েছে। একই সময়ে মাদক সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ১৪৬টি এবং এসব মামলায় ৫৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। টঙ্গী পশ্চিম থানায় ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৪০টি এবং মাদক সংক্রান্ত ১৬৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মাদকের বিস্তার শুধু মাদক সেবন বা বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। মাদক কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অপরাধীচক্রের মধ্যে বিরোধ তৈরি হচ্ছে। এসব চক্রের সঙ্গে ছিনতাইকারী ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদেরও যোগাযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রাতের বেলায় রেললাইন, স্টেশনসংলগ্ন এলাকা ও নির্জন সড়কে ছিনতাইয়ের আতঙ্কে অনেকেই চলাচলে সতর্ক থাকেন। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাও পরিস্থিতির ভয়াবহতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গোপালপুর এলাকায় নূরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তিকে আলেকেরটেক এলাকায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত এবং দুই পায়ের রগ কেটে হত্যার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনার পেছনে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের বিষয়টি থাকতে পারে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন।
এ ছাড়া টঙ্গীর ব্যাংকের মাঠ এলাকায় রেলস্টেশনের সামনে এক যুবক নিহত হওয়ার ঘটনায়ও স্থানীয়ভাবে মাদক ও অপরাধীচক্রের বিরোধের বিষয়টি আলোচনায় আসে। ওই ঘটনায় পুলিশ ও স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা থাকলেও তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা দরকার।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যদের মাদকবিরোধী অভিযানে টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি, এরশাদনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়েছেন। এসব অভিযানে মাদক ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারও করা হয়।
গত সেপ্টেম্বর মাসে টঙ্গী রেলস্টেশন এলাকায় পুলিশের ওপর হামলা করে হাতকড়াসহ এক আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ধরনের ঘটনায় অপরাধীচক্রের সাহস ও সাংগঠনিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু মাদকসেবী বা খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করে পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাদকের মূল সরবরাহকারী, অর্থের জোগানদাতা, পরিবহনকারী এবং স্থানীয় পর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে মাদককে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ছিনতাই ও অস্ত্রধারী চক্রের অর্থনৈতিক যোগসূত্র খুঁজে বের করার দাবি উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, নিয়মিত অভিযান ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি মাদকের মূল হোতা এবং অপরাধীচক্রের পেছনের অর্থের উৎস চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি কিশোর ও তরুণদের মাদক ও অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
কারণ টঙ্গী দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গে লাখো শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সরাসরি জড়িত। ফলে মাদক ও ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে শুধু তাৎক্ষণিক অভিযান নয়, অপরাধের শিকড় শনাক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়াকেই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অপরাধ দক্ষিণ বিভাগের উপ-কমিশনার শফিকুল ইসলাম খান বলেন, মাদকদ্রব্য ও সন্ত্রাস দমনে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। হাজী মাজার বস্তিসহ বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।