দৈনিক বিজয়বাংলা ডেস্ক :: বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে এখন মানুষ চিনতে শুরু করেছে ভিন্ন এক পরিচয়ে। ক্যান্সার নিয়ে সচেতনতা তৈরি এবং আক্রান্তদের দ্রুততম সময়ে শনাক্তকরণে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হওয়া তার মহতী উদ্যোগের নাম ‘সাকিব আল হাসান ক্যান্সার ফাউন্ডেশন’। ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান ফাউন্ডেশনটিকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেও এটির মূল উদ্যোক্তা যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সাবেক ক্রিকেটার কাফি খান। বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) সাবেক ছাত্র কাফি বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের অধিনায়ক ছিলেন।
জানা গেছে, সাকিব-কাফির একসময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ক্রিকেটার জাফর সাদেক রাসেল ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তার স্মরণে এবং দেশের অসহায় ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে এ স্বপ্নের যাত্রা। মাঝপথে আরেক বন্ধু ক্রিকেটার মোশাররফ হোসেন রুবেল এবং সাকিব আল হাসানের শ্বশুর-শাশুড়িও ক্যান্সারে মারা যান। তাদের মৃত্যু সেই স্বপ্নকে একটি ফাউন্ডেশন আকারে দাঁড় করানোর রসদ জুগিয়েছে। শুরুতে পরিকল্পনায় ছিল ফাউন্ডেশনটির নাম হবে ‘রাসেল স্মৃতি ক্যান্সার ফাউন্ডেশন’। পরবর্তীতে সর্বসম্মতিক্রমে নামকরণ করা হয় সাকিব আল হাসানের নামে।
সাবেক ও বর্তমান নয় ক্রিকেটার ২০১৭ সাল থেকে ফাউন্ডেশনটি তৈরির বিষয়ে কথাবার্তা শুরু করেন। মাঝপথে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মোশাররফ হোসেন রুবেল মারা যান। তার প্রয়াণে উদ্যোক্তার সংখ্যা দাঁড়ায় আটে। অলরাউন্ডার সাকিব (ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট) ছাড়াও তালিকায় আছেন কাফি খান (সেক্রেটারি), ক্রিকেটার নাঈম ইসলাম, আব্দুর রাজ্জাক রাজ, নাসিরুল ইসলাম, সোহরাওয়ার্দী শুভ, কোচ নাজমুল আবেদীন ফাহিম ও সারোয়ার ইমরান।
যেভাবে যাত্রা শুরু হয় সাকিব আল হাসান ক্যান্সার ফাউন্ডেশনের
ফাউন্ডেশনটির উদ্যোক্তা কাফি খান জানান, বিকেএসপিতে তার সহপাঠী ও সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন জাফর সাদেক রাসেল। তিনি মাত্র ৩১ বছর বয়সে মারা যান ক্যান্সারে। ক্যান্সার ধরা পড়তে পড়তে অনেক সময় পার হয়ে যায়। চিকিৎসার জন্য ঢাকা ও চেন্নাইয়ে প্রিয় বন্ধুকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করেছেন তিনি।
মাঝপথে ক্যান্সারেই প্রাণ হারান অন্যতম উদ্যোক্তা রুবেল
কাফি খান বলেন, শুরুতে আমরা মোট নয়জন ছিলাম। ক্রিকেটার মোশাররফ হোসেন রুবেল ছিলেন আমাদের সঙ্গে। তিনিও ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে ইতোমধ্যে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। রুবেল ভাই মারা যাওয়ার পর আমরা এখন আটজন আছি। এছাড়া আমাদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আছেন সাকিব আল হাসানের স্ত্রী শিশির। উনিও ক্যান্সারে মা-বাবাকে হারিয়েছেন।
ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীরা যেসব সেবা পাবেন
ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীরা কী কী সেবা পাবেন— এমন প্রশ্নের জবাবে ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি বলেন, যারা অর্থের ভাবে ডায়াগনোসিস পর্যন্ত যেতে পারেন না, তাদের যদি অল্প সহযোগিতা করা যায় অন্তত রোগটি শনাক্ত হবে। অর্থাৎ শুরুতে আমরা ডায়াগনোসিসটার ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে চাই। কেউ যদি এসে বলে এবং প্রমাণ দিতে পারে যে ক্যান্সার ডায়াগনোসিসে তার কোনো সামর্থ্য নেই, আমরা তখন তাকে নিয়ে কাজ করব। এক্ষেত্রে যখন আমাদের ফান্ডিংটা আরও মজবুত হবে, নিয়মিত ফান্ডিং আসতে থাকবে তখন আমরা চিন্তা করব এবং কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে মিলে এ কাজগুলো করতে পারি কি না।
সহযোগিতা পেতে যোগাযোগ ও রোগীদের করণীয়
সাকিব আল হাসান ক্যান্সার ফাউন্ডেশনের মূল উদ্যোক্তা কাফি খান বলেন, আমাদের ইচ্ছা আছে একটা কল সেন্টার করব। এটা ২৪ ঘণ্টা চালু থাকবে। কল সেন্টারে আমাদের যে টিম থাকবে, তাদের কিছু যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া থাকবে। বিশেষ করে কিছু প্রশ্ন থাকবে, যার মাধ্যমে আমরা সহজেই রোগীদের বাছাই করতে পারব। এরপর আমরা তাদের সহযোগিতা করব।
ক্যান্সার নিয়ে কাজ করতে পারায় খুশি সাকিব আল হাসানও
‘সাকিব আল হাসান ক্যান্সার ফাউন্ডেশন’ প্রসঙ্গে ক্রিকেটার সাকিব বলেন, ‘বিভিন্ন সময় আমি বিভিন্ন কাজের সঙ্গে জড়িত হয়েছি। চেষ্টা করেছি মানুষের পাশে থাকার। কিন্তু এবার আমি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কিছু করতে চাই। ক্যান্সার ফাউন্ডেশন করার পেছনে সত্যিকার অর্থে এটাই প্রধান কারণ। এ উদ্যোগে নিজেকে যুক্ত করতে পেরে খুবই ভালো লাগছে।’
‘ক্যান্সার এমন একটি অসুখ যাকে সবাই মরণব্যাধি বলে। কিন্তু এ মরণব্যাধির ভয়ে তো আর পিছিয়ে থাকলে চলবে না। আমাদের এ অসুখের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। মানুষকে সাহস দিতে হবে, ক্যান্সার আক্রান্তদের আশা দিতে হবে। ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আমরা এ কাজগুলো করতে চাই।’
ক্যান্সার ফাউন্ডেশন নিয়ে সাকিবের যত স্বপ্ন
সাকিব বলেন, আমাদের স্বপ্নটা অনেক বড়। আমরা চাই দেশে একটি উন্নতমানের ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণ করতে। যেখানে ক্যান্সারের পরিপূর্ণ ও আধুনিক সব চিকিৎসা থাকবে। সেখানে একদম কম খরচে চিকিৎসাসেবা নিয়ে সুস্থ হয়ে মানুষ হাসিমুখে বাড়ি ফিরবে। এক সময় সবাই গর্ব করে বলবে বাংলাদেশে এমন একটি হাসপাতাল আছে। যা ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। স্বপ্নটা বাস্তবায়ন করা হয়তো এখনই সম্ভব নয়, কিন্তু এক দিন অবশ্যই বাস্তবায়ন হবে, ইনশাআল্লাহ।
সাকিবদের পাশে থাকার ঘোষণা বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির
সাকিব আল হাসান ক্যান্সার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগের প্রশংসা করে পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সভাপতি ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। তিনি বলেন, ‘ক্যান্সারের ক্ষেত্রে সচেতনতা এবং শুরুর দিকে ধরতে পারাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ক্যান্সার হলে যে মানুষ মারা যাবে, জীবন শেষ— এমন পরিস্থিতি এখন কিন্তু নেই। রোগটা যদি আমরা দ্রুত শনাক্ত করতে পারি এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে পারি, তাহলে এখান থেকে ফিরে আসা সম্ভব। প্রতি বছর অসংখ্য ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছে।’
বিসিবি সভাপতি বলেন, ক্যান্সার চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আরও বেশি কঠিন। তবে, আমরা যদি মানুষকে সচেতন করে তুলতে পারি; সেই সঙ্গে দ্রুত শনাক্ত করতে পারি, তাহলে চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীর দ্রুত সুস্থতা নিশ্চিত করা সম্ভব। দেশে ক্যান্সার আক্রান্তের হারও কমে আসবে।
এ বিষয়ে মানুষের সচেতনতাও বেড়েছে— উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ এখন আগের তুলনায় অনেক সচেতন। এর অন্যতম একটি কারণ, আমরা কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছি। আরেকটি কারণ হলো, প্রযুক্তির উৎকর্ষতার কারণে মানুষ ক্যান্সারের নানা কারণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ সম্পর্কে জানতে পারছে। এখন যদি আমরা সাকিব আল হাসান ক্যান্সার ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আরেকটু কাজ করতে পারি, বিশেষ করে মানুষের কাছে সচেতনতাকে আরও বেশি ছড়িয়ে দিতে পারি, তাহলে ক্যান্সার প্রতিরোধে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারব।’
সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে পাপন বলেন, ‘আমি বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সভাপতি। ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলোর মধ্যে যারা ক্যান্সারের ওষুধগুলো বানাচ্ছে, তারাও যখন যা প্রয়োজন তা দিয়ে সহযোগিতা করবে। ব্যক্তিগতভাবে আমার তরফ থেকে শুধু সাকিব বলে নয়, সবার জন্য পুরোপুরি সাপোর্ট থাকবে।’