স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর:: গাজীপুর সদর উপজেলার ভবানীপুরে কালভার্টের নিচ থেকে লাগেজ ও প্লাস্টিকের বস্তা থেকে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত নারীর খণ্ডিত লাশের পরিচয় শনাক্ত এবং হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় নিহতের প্রেমিক, তার মা ও এক সহযোগীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার তিন জন হলেন—বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মাসকুর আলমের ছেলে মিশন ইসলাম (২২), তার মা বানু আক্তার (৪৩) এবং সহযোগী মিজানুর রহমান মিল্টন (২৪)।
পিবিআই জানিয়েছে, গ্রেফতার তিন জনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বটি ও দা, ভিকটিমের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), মোবাইল ফোন ও জুতা উদ্ধার করা হয়েছে। আজ সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে গাজীপুর মহানগরীর রাজদীঘির উত্তর পাড়ে পিবিআই কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান গাজীপুর জেলা পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার রকিবুল আক্তার।
নিহত নারীর নাম ডলি আক্তার (৩০)। তিনি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার পাহাড়পাবিজান গ্রামের বাদশা মিয়ার মেয়ে। স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর গাজীপুরের জয়দেবপুর থানাধীন বানিয়ারচালা (মেম্বারবাড়ী) এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। স্থানীয় বাঘের বাজার এলাকার ‘গোল্ডেন রিফিট গার্মেন্টস’ পোশাক কারখানায় সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন তিনি।
যেভাবে সম্পর্ক, যেভাবে শেষ:
চাকরি করার সময় মিশন ইসলামের সঙ্গে ডলির পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে তাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল। ডলি প্রায়ই মিশনের ভাড়া বাসায় যাতায়াত করতেন।
পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান আনসারী জানান, তদন্তে পাওয়া তথ্য ও আসামিদের আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দি অনুযায়ী গত মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাতে ডলি মিশনের ভাড়া বাসায় যান। সেখানে মিশন, তার মা বানু আক্তার ও ডলি একসঙ্গে রাতের খাবার খান। খাবার শেষে বানু আক্তার পাশের কক্ষে ঘুমাতে যান। মিশন ও ডলি একই কক্ষে অবস্থান করেন। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্বের বিয়ে সংক্রান্ত বিরোধের জেরে ডলির ওপর ক্ষুব্ধ ছিল মিশন। একপর্যায়ে তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। ওই রাতে মিশন ডলিকে ঘুমের ওষুধ ও অ্যালার্জির ওষুধ খাওয়ায়। ডলি ঘুমিয়ে পড়লে রাত ২টার দিকে লুঙ্গি দিয়ে তার গলায় পেঁচিয়ে এবং বালিশ দিয়ে মুখ চেপে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন আসামি। এরপর মরদেহটি ঘরের চৌকির নিচে লুকিয়ে রাখা হয়।
পরদিন বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকালে ঘর পরিষ্কার করার সময় বানু আক্তার চৌকির নিচে ডলির মরদেহ দেখতে পান। পরে মরদেহ গুম করার পরিকল্পনা করে মিশন। এজন্য একটি স্যুটকেস সংগ্রহ করা হলেও মরদেহ তাতে না ধরায় ব্লেড, বটি ও দা দিয়ে কোমর থেকে মরদেহ দ্বিখণ্ডিত করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পরে মরদেহের কোমরের নিচের অংশ লাগেজে এবং ওপরের অংশ পলিথিনে মুড়িয়ে প্লাস্টিকের বস্তায় রাখা হয়। এরপর মিশন তার বন্ধু মিজানুর রহমান মিল্টনকে বাসা পরিবর্তনের কথা বলে সহযোগিতার জন্য ডেকে আনে। মিল্টন বাসায় এসে স্যুটকেস ও বস্তা অটোরিকশায় তুলতে সহযোগিতা করে। পরে মিশন, তার মা বানু আক্তার ও মিল্টন মিলে স্যুটকেস ও বস্তা অটোরিকশায় করে রাজেন্দ্রপুর এলাকায় যায়। সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশাযোগে তারা ভবানীপুর এলাকায় পৌঁছায়। ভবানীপুর ব্রিজ এলাকা থেকে মিশন ও মিল্টন স্যুটকেস ও বস্তা কালভার্টের নিচের খালের পানিতে ফেলে দেয়।
যেভাবে পরিচয় শনাক্ত, গ্রেফতার তিন:
ডলি আক্তারকে হত্যার ঘটনায় তার বড় ভাই সোহেল (৪৪) শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) জয়দেবপুর থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন। ঘটনাটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর পিবিআই গাজীপুর জেলা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ছায়া তদন্ত শুরু করে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের পাশাপাশি বিশ্বস্ত সোর্স ব্যবহার করে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান আনসারী জানান, শনিবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে মিজানুর রহমান মিল্টনকে এবং একই দিন বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে মিশন ইসলাম ও তার মা বানু আক্তারকে গাজীপুর সদর মেট্রো থানাধীন বাহাদুরপুর (তুলসীভিটা) এলাকার পৃথক ভাড়া বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়।