August 5, 2026, 2:18 am

রাজধানীতে জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ প্লাস্টিক ও পলিথিনের বর্জ্য ॥ চরম ভোগান্তিতে নগরবাসী

Reporter Name
  • আপডেট Sunday, July 14, 2024
  • 125 জন দেখেছে

মো: মুর্শিকুল আলম :: কয়েকদিনের ভারীবর্ষণে রাজধানীসহ আশপাশের জেলাগুলোর বিভিন্ন এলাকা বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে সড়ক, বাসাবাড়িসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। বর্ষা মৌসুম আসলে এমন পরিস্থিতির শিকার হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী। জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে প্লাস্টিক ও পলিথিনের বর্জ্যকে। রাজধানীর বেশির ভাগ খাল, নালা, নর্দমা বহুল ব্যবহৃত প্লাস্টিকসামগ্রী ও নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন ব্যাগ থেকে সৃষ্ট বর্জ্যে ভরাট হয়ে থাকে বছরের পর বছর। মাঝেমধ্যে সিটি করপোরেশন কিছুটা অভিযান চালালেও কিছু দিনের মধ্যেই আবার একই পরিণতি দেখা যায়।
এইসব প্লাস্টিক ও পলিথিন বাজার থেকে ক্রেতাদের হাত ঘুরে ঢুকে যাচ্ছে ঘরে ঘরে। আবার বাইরেও রেস্তোরাঁয়, মেডিকেল বর্জ্যে, শিল্পকারখানায়ও বেশির ভাগ বর্জ্যের বড় অংশই থাকে প্লাস্টিক কিংবা পলিপ্যাকের আধিক্য। এসব বর্জ্যের কিছু অংশ সিটি কপোরেশনের নির্দিষ্ট ডাম্পিং স্টেশনে গেলেও বাকি সবই ফেলা হয় ড্রেন, নালা, নর্দমা ও কাছের খালে। নগরীর বিভিন্ন অলিগলির বেশির ভাগ ড্রেন ভরে থাকে প্লাস্টিক বা পলিথিন বর্জ্যে। খালের ওপর স্তূপ হয়ে থাকে নানা ধরনের প্লাস্টিকসামগ্রী এবং পলিথিন। ফলে বৃষ্টির পানি এসব খাল, নালা, নর্দমা হয়ে নদীতে পড়তে পারে না। বরং উপচে উঠে ডুবিয়ে দেয় সড়ক-বাসাবাড়ি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সব খাল, নালা, নর্দমা দখল-ভরাটে প্রায় শেষ হয়ে গেছে। যতটুকু আছে তা অপরিকল্পিত কাঠামোতে রয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা সরু ও অপ্রশস্ত। তার ওপর বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্যে ভরাট হয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ থাকে। ফলে অতিবৃষ্টি হলেই নগরীর বেশির ভাগ এলাকার পানি সরতে পারে না; সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। প্লাস্টিক ও পলিথিন পরিবেশের জন্য চরম ক্ষতি বয়ে আনে। মাটি, পানি, জনস্বাস্থ্য সবকিছুরই ক্ষতি করে। জলাবদ্ধতার বড় কারণ হয়ে উঠেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৬৪৬ টন প্লাস্টিক (পলিথিনসহ) বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়; যা দেশে দৈনন্দিন আবাসিক বর্জ্যের ১০ শতাংশ। এর মধ্যে ঢাকার প্লাস্টিক বর্জ্যের ৩৭ দশমিক ২ শতাংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য (রিসাইকেল উপযোগী)। অর্থাৎ প্রায় ৬৩ শতাংশ প্লাস্টিক বা পলিথিন বর্জ্যই রিসাইকেলের অনুপযোগী। অন্যদিকে রাজধানী ঢাকার বার্ষিক মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহার শহরাঞ্চলের জাতীয় গড় থেকে তিন গুণেরও বেশি। অর্থাৎ জনপ্রতি ২২ দশমিক ২৫ কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণ হয়।
বাংলাদেশে প্লাস্টিকদূষণ দিনে দিনে ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি ঘটছে। কেবল বাসাবাড়ি বা নালা-নর্দমাই নয়, পথেঘাটেও পড়ে থাকে নানা ধরনের প্লাস্টিক বা পলিথিন বর্জ্য। যদিও সিটি করপোরেশন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকে। প্লাস্টিক বর্জ্যসহ বেশির ভাগ বর্জ্য সংগ্রহ করা হয় অনানুষ্ঠানিক খাতের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে নেই পর্যাপ্ত বা উপযুক্ত কার্যকর পদক্ষেপ। প্লাস্টিকের বিকল্প ব্যবহারকে আরও নীতিগত উদ্যোগ এবং বাজারভিত্তিক প্রণোদনার মাধ্যমে কার্যকর করতে হবে। একবার ব্যবহারের (ওয়ান টাইম) প্লাস্টিকগুলো সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে রয়েছে পলিথিন বা প্লাস্টিক ব্যাগ, পরিষ্কার প্লাস্টিকের পাতলা মোড়ক, কফির কাপ এবং ঢাকনা, পাত্র, খড়, ক্যাপ এবং বোতল। এ ছাড়া প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের শিল্প, বিমানশিল্প, আবাসিক হোটেল, সুপারমার্কেট, রেস্তোরাঁ এবং খুচরা দোকান থেকেও নানা ধরনের প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয় প্রতিদিন।
এ ক্ষেত্রে ২০১৯ সালের তথ্য অনুসারে দেশে প্রতিবছর প্রায় ৮৭ হাজার টন একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ফেলে দেওয়া হয়। এই বর্জ্যের প্রায় ৯৬ শতাংশ আসে ভোক্তা আইটেম থেকে, যার মধ্যে ৩৩ শতাংশ অ-পুনর্ব্যবহারযোগ্য। ওয়ান টাইম প্লাস্টিকের একটি বড় অংশ সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয় না ফলে তা মাটি ও জলাশয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বৃষ্টিপাতের কারণে বাংলাদেশেও ল্যান্ডফিল থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য আশপাশের শহরের খাল ও নদীপথে জমা হয়। প্লাস্টিক বর্জ্য খালে পানির প্রবাহ বন্ধ করে ফেলে। প্লাস্টিকদূষণের কারণে ঢাকা শহরে ৬৫টি খালের মধ্যে আছে ২২টি খাল। তাও এখন ডাম্পিংয়ে পরিণত হয়েছে।
প্লাস্টিক পণ্যের অনিয়ন্ত্রিত উৎপাদন ও বাজারজাত চলছেই। দেশে পাঁচ হাজারের বেশি প্লাস্টিক পণ্য তৈরির কারখানা রয়েছে। তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, মাথাপিছু প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েছে অনেক। ২০০৫ সালে জনপ্রতি ব্যবহার ছিল মাত্র ৩ কেজি, ২০১৪ সালে তা উঠে যায় ৯ দশমিক ২ কেজিতে এবং ২০২০ সালে আরও বেড়ে উঠে যায় ২২ দশমিক ২৫ কেজিতে।

এ ক্ষেত্রে পলিথিনের ব্যাগ ও ওয়ান টাইম পণ্য বাদেও রান্নাঘর এবং টেবিলওয়্যার, ঢাকনা, বোতল, স্যানিটারি পণ্য, খেলনা, প্যাকেজিং এবং নির্মাণসামগ্রী তৈরিতে পলিথিনের ব্যবহার বেড়ে গেছে। প্লাস্টিকের পরিষ্কার ফিল্ম, বোতাম, পরিবহনসামগ্রী, টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং ইলেকট্রনিকসসহ অন্যান্য সেক্টরের জন্য যন্ত্রাংশ উৎপাদন বেড়েছে। এক হিসাবে মাত্র এক বছরে প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদন ৫৬ দশমিক ৮ মিলিয়ন কেজি থেকে বেড়ে ৬৩ মিলিয়ন কেজি হয়েছে। এমনকি রপ্তানিও বেড়েছে। ২০২১ সালে বিদেশে রপ্তানি হয়েছে ৫৫ মিলিয়ন কেজি প্লাস্টিকসামগ্রী।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের হিসাবে প্রতিদিন আমরা প্রায় সাড়ে তিন হাজার টন বর্জ্য অপসারণ করি। এর মধ্যে প্রায় ৪০০ মেট্রিক টন থাকে প্লাস্টিক বা পলিথিনজাতীয় বর্জ্য। আমাদের কোনো রিসাইকেল প্ল্যান্ট না থাকায় রিসাইকেল করতে পারি না।’
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ও মাতুয়াইল স্যানিটারি ল্যান্ডফিল সম্প্রসারণসহ ভূমি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক ড. মোহাম্মদ সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভূঁইয়া বলেন, ‘জাইকা একটি স্টাডি করেছিল। সেখানে তারা দেখিয়েছে ডিএসসিসির মোট বর্জ্যের ৪ থেকে ৫ শতাংশ প্লাস্টিক বর্জ্য। এসব বর্জ্য রিসাইকেল করার কোনো ব্যবস্থা ডিএসসিসির নেই। উৎস থেকেই প্লাস্টিক বর্জ্য আলাদা করতে পারলে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সম্ভব ছিল। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সবার সম্পৃক্ততা দরকার।
পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমরা প্লাস্টিক বা পলিথিন বর্জ্য ব্যবস্থা নিয়ে আগে যেসব কাজ করেছি, তা এখন তেমন কার্যকর হচ্ছে না। কারণ দিন দিন পলিথিনের ব্যবহার বেড়েই চলছে। তাই সরকার এখন নতুন পলিসি তৈরি করেছে। এর আওতায় যে কোম্পানি প্লাস্টিকসামগ্রী তৈরি ও বাজারজাত করবে, তারাই বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণের দায়িত্ব নেবে। এটা কার্যকর হলে অনেকটাই ভালো একটা পথ তৈরি হবে।

সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই সম্পর্কিত আরও খবর