স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর :: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী ও সুবিধাভোগীদের নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছেই। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে যে, গত ১৫ বছরে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা গ্রহণকারী অনেকে প্রকাশ্যে আছেন বা দল পরিবর্তন করার চেষ্টা করছেন। অভিযোগ উঠেছে, আসছে আগামী ৯মে অনুষ্ঠিত গাজীপুর সদর দলিল লিখক ও ভেন্ডার কল্যাণ সমিতির দ্বি-বার্ষিক নির্বাচনে “সভাপতি” পদে লড়বেন আওয়ালীগের আমলে সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী মজিবুর রহমান মোক্তার ও সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বদ্বিতা করবেন হাসিম উদ্দিন আহাম্মদ মিলন। মূলত: তারা ছিলেন পলাতক ফ্যাসিস্ট সরকারের সাবেক এমপি এবং প্রতিমন্ত্রীর মদদপুষ্ট। পূর্বে থেকেই এ কমিটিকে আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী হিসেবে তাদের গণ্য করা হতো। জানা গেছে, গাজীপুর সদর সাব রেজিস্ট্রি অফিসের আম মোক্তাদের কাজ পরিচালিত হয় মো. মুজিবুর রহমান মোক্তারের নিজ এলাকা সিটি কর্পোরেশনের ২৬ নং ওয়ার্ডের মারিয়ালী থেকেই। রেজিস্ট্রার অফিসের কার্যক্রম, টাকার ভাগ বন্টন পরিচালনা হয় তাদের ইচ্ছা মত। অফিস সূত্রে জানা যায়, রেজিস্ট্রার অফিসে দলিল সম্পাদনে মাথাপিছু দলিলে মোক্তার সমিতির সভাপতি ৩হাজার ১শত টাকা করে আদায় করতেন। তার পাশাপাশি নকল নবীশ এর নামে ইন্ডেক্স করানোর নাম করে হাতিয়ে নিতো ২০০ টাকা। যেখানে নকল নবীশ পায় মাত্র ২৪ টাকা, আর বাকি টাকা অফিসের সাব রেজিস্টার মোক্তার সমিতির সভাপতি, সাধারণত সম্পাদক, কেরানী সহ ভাগ বন্টন করে একেক জন বানিয়েছে টাকার পাহাড়। এই সিন্ডিকেটের থাবা থেকে রেহাই নেই সাধারণ নকল নবীশ সমিতিরও।
এভাবেই গাজীপুর সদর সাব বেজিষ্ট্রার অফিসের মত সরকারের বৃহৎ রাজস্ব ক্ষাত দিন দিন ধ্বংস করে দিচ্ছে মজিবুর রহমান মোক্তার ও হাসিম উদ্দিন আহাম্মদ মিলন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত দিনে দুর্নীতি মামলায় মুজিবুর রহমান মোক্তারের সনদ বাতিল হয় এবং তাকে জেলেও যেতে হয়েছিল। নানা জায়গায় ঘুষ দিয়ে আবারও নতুন করে সনদ পান মজিবুর রহমান মোক্তার। অত্যন্ত চালাক চতুর মহাপরিকল্পনা করে গাজীপুর সদর রেজিস্ট্রি অফিসে আজীবন আধিপত্য ধরে রাখতে বিগত সময় নিজের এলাকা ২৬ নং ওয়ার্ড মারিয়ালীতে মোক্তার সমিতির নামে জমি ক্রয় করেন তিনি। বিভিন্ন ভাবে সরকারি মহলের কর্মকর্তাদের অর্থ প্রলোভন দেখিয়ে, গাজীপুর সদর সাব রেজিস্ট্রার অফিস ও রেকর্ড অফিসের জন্য মোক্তার সমিতির নামে ক্রয়কৃত জমি অধিগ্রহণ করেন। জমির উপর দালান নির্মাণের জন্য জোরালো তদবির চালান স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে। দালান নির্মাণ কাজ শুরু করে সর্বোচ্চ তড়িৎ গতিতে সমর্পণ করে এবং সাবেক সংসদ সদস্য কাছ থেকেও গাজীপুর সদর রেজিস্ট্রার অফিস ও যুগ্ম অফিসসহ রেকর্ড নিজ এলাকায় নির্মিত ভবনে স্থানান্তরের আদেশ করান।
অভিযোগ রয়েছে, ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগের কর্মকান্ডের সাথে দীর্ঘদিন জড়িত ছিলেন সমিতির সভাপতি মুজিবর রহমান মোক্তার ও সাধারণ সম্পাদক হাসিম উদ্দিন আহাম্মদ মিলন। বিগত দিনে ১৫ আগস্ট পালন, স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার জন্মদিন পালন থেকে শুরু করে আহসান উল্লাহ মাস্টার এমপির কবর জিয়ারত, সাবেক প্রতিমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোসহ বিভিন্ন দলীয় প্রোগ্রামে সামনের সারিতে থাকতেন তারা। তা ছাড়া অর্থের প্রভাবে দলীয় নেতা-নেত্রীদের প্রভাবিত করে সিন্ডিকেট করে তাদের নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতেন। এই সিন্ডিকেট বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলেও আওয়ামী লীগের এজেন্ট হিসেবে সক্রিয় ভুমিকা পালন করে আসছে।
জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর নির্বাচনের মাধ্যমে গাজীপুর সদর দলিল লেখক ও ভেন্ডার কল্যাণ সমিতির সর্ব শেষ কমিটি গঠন করা হয়। এতে মজিবুর রহমানকে সভাপতি ও মো: ফারুক হোসেনকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।
এরপর ২০১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর ৩ সদস্যের এডহক কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তী ২০১৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার দীর্ঘদিন পরও গঠনতন্ত্র মোতাবেক পদক্ষেপ না নেয়ায় ওই ৩ সদস্যের এডহক কমিটি ভেঙে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ দেন জেলা সমাজসেবা কার্যালয়।
পরবর্তী গাজীপুর মহানগর আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি সঞ্জীব কুমার মল্লিক বাবুর লবিংয়ে সিলেকশনের মাধ্যমে ২০২২-২৩ সালের গাজীপুর সদর সাব রেজিস্ট্রার দলিল লেখকদের কল্যাণ সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন মুজিবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক পদে হাসিম উদ্দিন আহম্মদ মিলন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সাধারণ দলিল লেখকরা জানান, সাব রেজিষ্ট্রার অফিস তাদের নিজ এলাকায় হওয়াতে মজিবুর রহমান মোক্তার ও হাসিম উদ্দিন আহাম্মদ মিলনের ভয়ে আমাদের আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। তারা আরো বলেন, মজিবুর রহমান মোক্তার ও হাসিম উদ্দিন আহাম্মদ মিলন এখনো আওয়ামী লীগের এজেন্ট হিসাবে সক্রিয় ভুমিকা পালন করে আসছে।
সাধারণ দলিল লেখকরা আগামী নির্বাচনে তারা নতুন মুখ দেখতে চায় এবং একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন করা জরুরি। যা সমিতির কার্যক্রমে গতি আনবে এবং নতুন কমিটির মাধ্যমে সাধারণ সদস্যদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনবে।
এসব বিষয়ে মুজিবুর রহমান মোক্তারকে ফোন করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। অপরদিকে যোগাযোগ করা হলে হাসিম উদ্দিন আহাম্মদ মিলন মুঠোফোনে জানান, আমাদের বিরুদ্ধে যারা বলেছে তারা এসব মিথ্যা বলেছে, নির্বাচনকে সামনে রেখে মানুষ নানান কথা বলতেই পারে। তবে যাচাই-বাছাই করে সংবাদ প্রকাশ করার অনুরোধ করেন তিনি।
অফিস সূত্রে জানা যায়, এ নির্বাচনে সভাপতি পদে ৪ জন ও সাধারণ সম্পাদক পদে তিনজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। নির্বাচনে ৩শত ৭৮ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।