July 29, 2026, 5:58 pm

গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাঁঠালের বীজ থেকে খনিজসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন

Reporter Name
  • আপডেট Wednesday, July 29, 2026
  • 15 জন দেখেছে

মো: মুর্শিকুল আলম, গাজীপুর:: দেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল উৎপাদিত হলেও মৌসুমি প্রাচুর্য, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তির অভাব এবং দুর্বল বাজার ব্যবস্থার কারণে এর একটি বড় অংশ অপচয় হয়ে যায়। কাঁঠালের প্রায় অর্ধেক অংশ, বিশেষ করে বীজ, খোসা ও অন্যান্য অংশ বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হয়। অথচ এসব বর্জ্য অংশের মধ্যে, বিশেষ করে কাঁঠালের বীজে, রয়েছে মানবদেহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন খনিজ (মিনারেল) ও পুষ্টি উপাদান, যা অব্যবহৃত বীজের সঙ্গে নষ্ট হয়ে যায়। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য প্রকৌশল বিভাগের প্রখ্যাত খাদ্যবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. মো. এমদাদুল হক এবং তাঁর স্নাতকোত্তর গবেষক মো. আকরাম হোসেন যৌথ গবেষণার মাধ্যমে কাঁঠালের বীজ থেকে ঘনীভূত খনিজসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান (মিনারেল কনসেন্ট্রেট) তৈরির অভিনব প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন, যা ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের পেটেন্টও অর্জন করেছে।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমানের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় এবং গবেষকদ্বয়ের দীর্ঘ তিন বছরের গবেষণার মাধ্যমে ২০২৫ সালের নভেম্বরে এ যুগান্তকারী প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়। এ উদ্ভাবনের মাধ্যমে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট উদ্ভাবিত প্রযুক্তির সংখ্যা ২১টিতে পৌঁছেছে। এছাড়া ‘গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে নাম পরিবর্তনের পর এটিই প্রথম পেটেন্টপ্রাপ্ত উদ্ভাবন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, শুকনো কাঁঠালের বীজে প্রায় ২ শতাংশ খনিজ উপাদান থাকলেও উদ্ভাবিত এ প্রযুক্তির মাধ্যমে তা ঘনীভূত করে ৩৩ শতাংশেরও বেশি খনিজ উপাদানসমৃদ্ধ মিনারেল কনসেন্ট্রেট তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ খনিজের ঘনত্ব প্রায় ১৬ থেকে ১৭ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা যায়। মানবদেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, হাড় ও দাঁতের গঠন, রক্ত উৎপাদন, স্নায়ুতন্ত্র ও পেশির কার্যক্রম, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং বিভিন্ন এনজাইমের কার্যকারিতা বজায় রাখতে খনিজ উপাদানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, জিঙ্ক ও ম্যাঙ্গানিজের মতো খনিজ উপাদানের ঘাটতি এখনও দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠীর পুষ্টি সমস্যার অন্যতম কারণ।
গবেষকদ্বয়ের মতে, কাঁঠালের বীজ থেকে প্রাপ্ত এই মিনারেল কনসেন্ট্রেট বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে ব্যবহার করে অধিক পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এ উদ্ভাবনের ফলে এতদিন অবহেলিত ও অপচয় হওয়া কাঁঠালের বীজ একটি উচ্চমূল্য সংযোজিত খাদ্য উপাদানে পরিণত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এটি খাদ্য অপচয় কমানোর পাশাপাশি কৃষিজ বর্জ্যের কার্যকর ব্যবহার, পরিবেশ সংরক্ষণ, পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান এ প্রযুক্তি উদ্ভাবন বিষয়ে বলেন, এটি শুধু একটি পেটেন্ট অর্জনের বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি গবেষণার জন্য একটি নতুন মাইলফলক। আমাদের গবেষকরা প্রমাণ করেছেন, কৃষিজ বর্জ্য হিসেবে পরিচিত একটি উপাদানকে কীভাবে উচ্চমূল্যের পুষ্টিসমৃদ্ধ সম্পদে রূপান্তর করা যায়।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবনী গবেষণার পরিবেশ আরও শক্তিশালী করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য গবেষণাগারের উদ্ভাবনকে শিল্প ও সমাজের উপযোগী প্রযুক্তিতে রূপান্তর করে দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর অবদান রাখা।
প্রফেসর ড. মো. এমদাদুল হক বলেন, কাঁঠালের বীজ থেকে ঘনীভূত খনিজসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান তৈরির এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা গেলে দেশে নতুন পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যপণ্য উন্নয়নের পাশাপাশি কাঁঠালভিত্তিক শিল্পের বিকাশ, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং কৃষিজ সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই সম্পর্কিত আরও খবর