নিজস্ব প্রতিবেদক:: গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। কখনো ওষুধ উৎপাদনকারী কারখানা, কখনো বাণিজ্যিক স্থাপনা—অগ্নিকাণ্ডের এসব ঘটনা ঘিরে উঠছে নানা প্রশ্ন। এসব কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো কারণ? পরিকল্পিত নাশকতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় কি? উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও নির্ভরযোগ্য তদন্ত।
সর্বশেষ শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর এলাকায় দি ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের কারখানায় আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। প্রাথমিক সংবাদে কারখানার নিচতলার স্টোর ও হারবাল বিভাগের এলাকায় আগুনের কথা জানা যায়। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
এর মাত্র তিন দিন আগে, গত বুধবার (১৪ অক্টোবর), টঙ্গীর চেরাগ আলী এলাকায় ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের ওষুধ কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ২১টি ইউনিট কাজ করে। অগ্নিকাণ্ডে কারখানার বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ফায়ার সার্ভিসের এক সদস্য শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন। ওই ঘটনার কারণ নির্ধারণেও তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা জানানো হয়েছিল।
অন্যদিকে, ১৬ অক্টোবর শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে টঙ্গীর চেরাগ আলী এলাকার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে প্রেসক্লাব মার্কেটে আগুন লাগে। আগুনে মার্কেটের নয়টি দোকান পুড়ে যায়। খবর পেয়ে টঙ্গী ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে আগুনের সূত্রপাত ও ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
একই জেলার শিল্প ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় অগ্নিকাণ্ডের একাধিক ঘটনা ঘটায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—কারখানাগুলোর অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর? বৈদ্যুতিক ত্রুটি, যন্ত্রপাতির সমস্যা, দাহ্য রাসায়নিকের অনিরাপদ সংরক্ষণ কিংবা নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা কি এসব ঘটনার কারণ? নাকি কোনো ঘটনায় পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমাননির্ভর আলোচনায় নয়, বরং তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা জরুরি। একাধিক স্থানে আগুন লাগার ঘটনাকে একসূত্রে গাঁথার আগে প্রতিটি ঘটনার সময়, স্থান, আগুনের উৎস, আলামত এবং তদন্তের ফলাফল পর্যালোচনা করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পৃথক তদন্তের পাশাপাশি ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা যাচাই করা। প্রয়োজনে সিসিটিভি ফুটেজ, বৈদ্যুতিক সংযোগ, অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা, কারখানার নিরাপত্তা নথি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কারখানাগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন, জরুরি নির্গমনপথ, দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণের নিয়ম এবং নিয়মিত নিরাপত্তা পরিদর্শন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। গাজীপুর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। এখানে ওষুধ কারখানা ও অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা শুধু আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়; এর সঙ্গে শ্রমিকদের জীবন, কর্মসংস্থান, উৎপাদনব্যবস্থা এবং জননিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িত।
তাই প্রতিটি ঘটনার তদন্তের অগ্রগতি, অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং ক্ষয়ক্ষতির তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন। কোথাও অবহেলা বা নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। আর পরিকল্পিত নাশকতার প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—গাজীপুরে ধারাবাহিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো কি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা, নাকি কোনো ঘটনার পেছনে রয়েছে পরিকল্পিত নাশকতা? তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তবে জননিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।