আব্দুল কাদের:: শহরজীবনের ব্যস্ততা, প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তারের মধ্যে বইপড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক চ্যালেঞ্জ। এ বাস্তবতায় গাজীপুরের টঙ্গীতে পাঠাভ্যাস বৃদ্ধি, সাহিত্যচর্চা এবং সৃজনশীল মনন বিকাশে ভূমিকা রেখে চলেছে শুচি পাঠচক্র ও পাঠাগার। বই পড়া, সাহিত্য আলোচনা, কবিতা ও গ্রন্থ পরিচিতি, লেখক-পাঠকের মতবিনিময়সহ নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সংগঠনটি স্থানীয় সাহিত্যপ্রেমীদের মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে।
প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদসূত্র অনুযায়ী, ২০০২ সাল থেকে শুচি পাঠচক্র ও পাঠাগার পাঠকসমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা শাহজাহান শোভন। টঙ্গীর চেরাগ আলী মার্কেট এলাকায় এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বিষয়ভিত্তিক পাঠচক্র, বইপাঠের প্রতিযোগিতা, শিক্ষা ভ্রমণ এবং জাতীয় দিবস পালনসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সংগঠনটি পাঠ ও সংস্কৃতিচর্চাকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
সাহিত্য ও সৃজনশীলতার চর্চা:
শুচি পাঠচক্র ও পাঠাগারের উল্লেখযোগ্য দিক হলো সাহিত্যকেন্দ্রিক আয়োজন। কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে পাঠকের সংযোগ তৈরি, নতুন বইয়ের পরিচিতি তুলে ধরা, গ্রন্থের বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে সাহিত্যচর্চার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
২০২৫ সালের ৫ মে টঙ্গীর চেরাগ আলী এলাকায় কবি ফুয়াদ সরকারের ‘রাণী সঙ্গমে অনিবার্য আত্মহনন’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন ও আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ আয়োজনে স্থানীয় সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিরা অংশ নেন।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের ১১ জুলাই উদীয়মান কবি মো. আলাল সরকারের ‘জীবনের রংধনু’ কাব্যগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনেও শুচি পাঠচক্র ও পাঠাগার যুক্ত ছিল। এসব আয়োজন স্থানীয় লেখক ও কবিদের সাহিত্যকর্ম পাঠকের সামনে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করছে।
বইপড়া থেকে সামাজিক সচেতনতা:
পাঠাগার কেবল বই সংগ্রহ ও পাঠের স্থান নয়; এটি জ্ঞান বিনিময়, মুক্তচিন্তা এবং সামাজিক সচেতনতা বিকাশেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। নিয়মিত পাঠচক্রের মাধ্যমে পাঠকেরা সাহিত্যকর্মের অন্তর্নিহিত ভাবনা, জীবনবোধ ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ পান। এতে যুক্তিনির্ভর চিন্তা, ভিন্নমতকে বোঝার মানসিকতা এবং সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি বিকাশের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
২০২৬ সালের ২৩ এপ্রিল বিশ্ব বই ও কপিরাইট দিবস উপলক্ষে যুগান্তর স্বজন সমাবেশ, টঙ্গী শাখা এবং শুচি পাঠচক্র ও পাঠাগারের যৌথ উদ্যোগে টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকার আল-হেলাল স্কুল প্রাঙ্গণে বর্ণাঢ্য আয়োজন করা হয়। সেখানে আলোচনা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং বই পড়ার গুরুত্ব তুলে ধরে পাঠাভ্যাস বৃদ্ধির আহ্বান জানানো হয়।
একই বছরের ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে শুচি পাঠচক্র ও পাঠাগারে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। শিক্ষকসমাজের মর্যাদা, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে শিক্ষকের ভূমিকা এবং নতুন প্রজন্মকে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়গুলো আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
নতুন প্রজন্মকে বইমুখী করার প্রত্যাশা:
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা গেলে তাদের ভাষাজ্ঞান, চিন্তাশক্তি, কল্পনাশক্তি ও বিশ্লেষণী দক্ষতা বিকাশে সহায়তা পাওয়া সম্ভব। এ ক্ষেত্রে পাঠাগারভিত্তিক কার্যক্রমের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, লেখক, সংস্কৃতিকর্মী এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
শুচি পাঠচক্র ও পাঠাগারের মতো উদ্যোগকে আরও কার্যকর করতে শিশু-কিশোরদের উপযোগী বই সংগ্রহ, নিয়মিত পাঠ প্রতিযোগিতা, শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে পাঠচক্র, লেখক-পাঠক সংলাপ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক বইপড়ার কর্মসূচি সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে পাঠাগারের বইয়ের সংগ্রহ ও ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ পাঠচর্চাকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, টঙ্গীর সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার পরিসরে শুচি পাঠচক্র ও পাঠাগারের কার্যক্রম বইপড়া এবং সৃজনশীল চিন্তার প্রসারে একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। ধারাবাহিক কর্মসূচি, নতুন প্রজন্মের সম্পৃক্ততা ও সামাজিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে এ ধরনের পাঠাগারভিত্তিক উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে জ্ঞাননির্ভর ও মানবিক সমাজ গঠনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।