মো: মুর্শিকুল আলম :: রাজধানীর ঢাকা মহানগরীতে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি সিটি বাস চলাচল করে। এসব গণপরিহনে দিনে যাতায়াত করেন ২০-২৫ লাখ মানুষ। জীবিকা নির্বাহসহ নানা কাজে মানুষকে ভিড় ঠেলে একরকম যুদ্ধ করে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। কিন্তু নগরবাসীর যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ এসব বাহনে স্বাস্থ্যবিধি মানার ন্যূনতম কোনো বালাই নেই। বাসের ভেতরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার কোনো উদ্যোগ নেই, নেই কোনো নজরদারিও।
বছরের পর বছর ঢাকার নগর পরিবহনগুলো সিট, জানালা ও হ্যান্ডেল পরিষ্কার না করেই চলছে। যার কারণে বাসের অধিকাংশ সিটের কাভার ছেঁড়া ও ধুলোবালিতে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। হ্যান্ডেলগুলোও কালচে হয়ে গেছে। ফলে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন যাত্রীরা, যা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির তৈরি করছে। এতে ফ্লুসহ স্ক্যাবিস বা ফাঙ্গাল ইনফেকশন, চর্মরোগ এমনকি যক্ষ্মার মতো রোগও ছড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা। এইসব খাত থেকে পরিবহন মালিকরা প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা আয় করছেন। কিন্তু বাসে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার বিষয়ে তাদের নেই কোনো ভ্রূক্ষেপ। অনেক বাসের ভেতরের অংশ যাত্রীদের থুতু, কাশি কিংবা বমির দাগে ভরা, যেন জীবাণুর এক আঁতুড়ঘর।
এছাড়াও পরিবহনগুলোতে যাত্রীদের বসার স্থান পরিষ্কার তো করাই হয় না, এমনকি জীবাণুনাশক দিয়েও একবার মোছা হয় না। ফলে দিন দিন যাত্রীদের দেহে ছড়াচ্ছে জীবাণু, সেইসঙ্গে নীরবে ছড়াচ্ছে সংক্রমণ। এর বাইরে বাসের সিটের বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে জানালায় ভাঙা কাচ থাকার মতো সমস্যা তো রয়েছেই। বাসের চালক ও হেল্পারদের আচরণ নিয়েও রয়েছে যাত্রীদের অসন্তোষ ও অভিযোগ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা যাত্রীদের অভিযোগ আমলে নেন না।
গণপরিবহনে নিয়মিত যাতায়াত করা যাত্রীরা বলেন, আমরা গাড়ির হেলপারকে বলেছিলাম ‘সিটে ময়লা, একটু মুছে দেন’। হেলপার উত্তরে বলল, আমরা দিনে কয়বার মুছব? ভালো না লাগলে নেমে যান। হেলপাররা এমন ব্যবহার করলে আমরা কাকে বলব? আমাদের তো গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে। তাই আর কিছু বলতে পারি না।
যাত্রী মতিউর রহমান বলেন, সিটে বসলে প্যান্ট নষ্ট হয়ে যায়, কারণ স্পঞ্জ বেরিয়ে থাকে। সামনের সিটে পানি পড়ে স্পঞ্জগুলো স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছে। অনেক সময় কেউ যদি বমি করে, সেটা শুকিয়ে গেলেও গন্ধ থেকে যায়। এই শুকিয়ে থাকা বমি বহন করে অসংখ্য রোগের জীবাণু, যা মানুষে মানুষে ছড়িয়ে যায়। যে পরিমাণ ভাড়া নেয়, তার তুলনায় সেবার মান নেই বললেই চলে। দেখলেই বোঝা যায় বাসগুলো পাঁচ-ছয় বছর ধরে মেরামত পর্যন্ত করা হয়নি।
যাত্রীদের এ ধরনের অভিযোগ মানতে নারাজ পরিবহনের চালক-হেলপাররা। তাদের দাবি, প্রতিদিন সিটের কাভার ধোয়া সম্ভব না। তবে রাতে তারা গাড়ির সিট কাভার মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
এ বিষয়ে চালক তোফাজ্জল বলেন, ভোর থেকে বাসে নানারকম যাত্রী উঠে-নামে। কতজনের দিকে আমরা খেয়াল রাখতে পারি, কে বমি করল আর কে পানের পিক কিংবা চুন সিটের কাভারে মুছে গেল। আমাদের পক্ষে তো প্রতিদিন সিটের কাভারগুলো ধোয়া সম্ভব না। তবে রাতে গাড়ি গ্যারেজে নিয়ে যাওয়ার আগে ভেজা কাপড় দিয়ে পুরো গাড়ির সিট কাভার মুছে দিই।
যাত্রীদের দাবি স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতে প্রতিটি বাসে সপ্তাহে অন্তত একবার জীবাণুনাশক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। ছেঁড়া সিট কাভার পরিবর্তনের জন্য মালিকদের বাধ্য করতে হবে। নিয়মিত তদারকির আওতায় এনে প্রয়োজনে বাসের জন্য স্বতন্ত্র পরিচ্ছন্নতা কর্মী নিয়োগ দিতে হবে। প্রয়োজনে সিটি কর্পোরেশনের অধীনে বাস স্ট্যান্ডে ওয়াশিং জোন চালু করা যেতে পারে। চালক-হেল্পারদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যাত্রীসেবামুখী মানসিকতা তৈরি করতে হবে বলেও মনে করেন তারা।
পরিবহন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গাড়ির চালক-হেলপাররা অপরিচ্ছন্নতার প্রশ্নে দায়িত্ব এড়ানোর অজুহাত খোঁজেন। নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকি দূর করতে হলে এই উদাসীনতা বন্ধ করে নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণপরিবহনের ভেতরের অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন অবস্থা শুধু অস্বস্তিকরই নয়, স্বাস্থ্যঝুঁকিরও কারণ।
মেডিসিন ও চর্মরোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, বাসে যদি নিয়মিত জীবাণুনাশক ব্যবহার করা না হয়, তাহলে ফ্লু, ইনফ্লুয়েঞ্জা, সর্দি-কাশি হতে পারে। বাসে বসে থাকা, হ্যান্ডেল ধরা বা জানালায় স্পর্শের মাধ্যমে হেপাটাইটিস, স্ক্যাবিস বা ফাঙ্গাল ইনফেকশন, চর্মরোগ এমনকি যক্ষ্মার মতো রোগও ছড়াতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য এটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। একজন রোগী বাসে হাঁচি-কাশি দিলে তার জীবাণু ঘনবসতিপূর্ণ এই পরিবেশে ছড়াতে বেশি সময় লাগে না। এরপর অন্য কেউ সেটা হাত বা কাপড়ে নিয়ে বাসায় ফিরলে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। প্রতিদিন প্রতিটি গাড়ি গ্যারেজ থেকে বের করার আগে সিট, হাতল, জানালাসহ সব ভালোভাবে ধোয়া এবং পুরো গাড়িতে জীবাণুনাশক স্প্রে করা উচিত।