দেওয়ান মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, বিশেষ প্রতিবেদক:: রাজধানীর মিরপুরের গার্মেন্টস কারখানা ও কেমিক্যাল গোডাউনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১৬ জন মারা গেলেন। হতাহত হয়েছেন অনেকে। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানা গেছে।
অগ্নিকাণ্ডের ৯ ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে যোগ দেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশ, র্যাব ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা এখন বোমার শহর। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাদের আশঙ্কা, সতর্ক না হলে ঢাকার অলিগলিতে নীরবে আবার জেগে উঠতে পারে এমন মৃত্যুপুরী।
অবশ্য বিস্ফোরণ বিশেষজ্ঞ ও অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিগত সরকারের আমলে পুরান ঢাকা, মিরপুর ও উত্তরাসহ বেশ কিছু এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল গোডাউন উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। কিন্তু সেই অভিযান বর্তমানে দেখা যায়নি। কাজেই মিরপুর তো ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল গোডাউনের তালিকায় ছিল। সরকারের উচিত ছিল আগে থেকে সতর্ক থাকার। তাহলে হয়তো নতুন করে এ ট্রাজেডি দেখতে হতো না।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ২৭,৬২৪টি বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। এ ঘটনাগুলোতে ৭৯২ কোটি টাকার বেশি সম্পদের ক্ষতি হয় এবং ১০২ জন নিহত হন। ২০২৪ সালে সারাদেশে মোট ২৬,৬৫৯টি বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এসব আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন ১৪০ জন, আহত হয়েছেন ৩৪১ জন। ২০২৫ সালের প্রথম ৭ মাসে ১৫৪ জন আগুন ও বিস্ফোরণের ঘটনায় মারা গেছেন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পুরান ঢাকায় ২৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন বা রাসায়নিক পণ্যের গুদাম রয়েছে। এসবের মধ্যে ১৫ হাজার আছে খোদ বাসাবাড়িতেই। তাছাড়া সারা ঢাকা শহরে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন রয়েছে। এর মধ্যে ফায়ার সার্ভিসসহ অন্যান্য সংস্থা ৪,৮৫০টিরও বেশি গোডাউনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যার মধ্যে মিরপুর ও উত্তরা রয়েছে। ঢাকা শহরে প্রায় ৪ হাজার ব্যবসায়ী রাসায়নিক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
২০১৯ সালে ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল গোডাউন উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। পরে এফবিসিসিআইয়ের অনুরোধে ডিএসসিসি উচ্ছেদ অভিযান সাময়িক স্থগিত করে। এরপর আর অভিযান শুরু হয়নি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কেমিক্যালের দোকানগুলোতে সারি সারি প্লাস্টিকের ড্রাম আর দাহ্য রাসায়নিক পদার্থে ঠাসা। কোনো কোনোটিতে আবার বস্তাভর্তি দাহ্য কেমিক্যাল। তার ঠিক ওপরেই এলোমেলোভাবে ঝুলছে অসংখ্য বৈদ্যুতিক তার। দোকানের ওপরেই রয়েছে বাসাবাড়ি। পুরান ঢাকার আরমানিটোলা, লালবাগ, কোতোয়ালি, বংশাল, চকবাজারসহ বেশিরভাগ এলাকার কেমিক্যাল দোকানগুলোর এমন দৃশ্য চোখে পড়ে।
এছাড়া পুরান ঢাকার আবাসিক ভবনগুলোর নিচতলায় বেশিরভাগই বিভিন্ন কারখানা ও গোডাউন থাকে। এসব গোডাউনেই মজুত থাকে প্লাস্টিকের ড্রাম আর দাহ্য রাসায়নিক পদার্থে ভর্তি বস্তা। এসব গুদামে রয়েছে গ্লিসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রোস, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, মিথাইল ইথাইল কাইটন, থিনার, আইসোপ্রোইলসহ বিভিন্ন দাহ্য পদার্থ আগুনের সংস্পর্শে এলে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
এদিকে গোয়েন্দা পুলিশের ধারণা, বর্তমানে কেমিক্যাল আমদানি নীতিমালাও পুরোপুরিভাবে সংস্কার করা হয়নি। দেশে ৯ ধরনের কেমিক্যাল আমদানি করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে মাত্র ৩ ধরনের বহন, ব্যবহার ও সংরক্ষণের জন্য নীতিমালা রয়েছে। বাকি ৬ ধরনের কোনো নীতির তোয়াক্কা না করেই ব্যবহার করা হয়। এই ৬ ধরনের কেমিক্যালের আড়ালে বিভিন্ন বিস্ফোরক ও নেশাজাতীয় কেমিক্যাল আমদানি করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন বলেন, সারা ঢাকায় আমাদের গবেষণায় উঠে এসেছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার অবৈধ কেমিক্যাল গোডাউন রয়েছে। এগুলো না সরালে কিছুতেই বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের পর ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটি বেশকিছু সুপারিশ জানায়। কিন্তু এসব কেউ আমলে নেয়নি। যাদি আমলে নিতো তাহলে এসব ঘটনা অনেকটাই কমে আসতো।