আক্তার হোসেন ঢালী:: গাজীপুরের পোড়াবাড়িতে শাহ সুফী ফসিহ উদ্দিনের মাজার। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, বরং শিক্ষা, মানবিক সহায়তা ও এলাকার ঐতিহ্যের সঙ্গেও জড়িয়ে থাকা একটি প্রতিষ্ঠান। একসময় মাজারে নিয়মিত মানুষের সমাগম হতো। প্রতি বছর আষাঢ় ও কার্তিক মাসে দুটি ওরসকে ঘিরে বসত মেলা। আসতেন দূরদূরান্তের ভক্তরা। মাজারের উদ্যোগে পরিচালিত হতো এতিমখানা ও মাদ্রাসা। অর্থায়ন করা হতো একটি উচ্চবিদ্যালয়েও। অসহায় ও মুসাফিরদের জন্য ছিল খাবারের ব্যবস্থা। কিন্তু গত ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর মাজারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার পর থেকে এসব কার্যক্রমে বড় ধরনের ছেদ পড়ে। প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মাজারটি আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এখন সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অংশগ্রহণ সীমিত। বন্ধ রয়েছে নিয়মিত আয়োজন, ওরসের মেলা এবং মাজারকেন্দ্রিক বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম। ফলে শুধু ভক্তদের ধর্মীয় চর্চাই ব্যাহত হচ্ছে না, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষা ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও।
বর্তমানে মাজারের দেখভাল করছেন সাদেকের নেতৃত্বাধীন একটি পক্ষ। সাদেকের দাবি, শাহ সুফী ফসিহ উদ্দিন তাঁর দাদা। তাঁর বাবা মাজারের জন্য ১৯ শতাংশ জমি ওয়াক্ফ করেছিলেন। তবে আদালতের রায়ে সেই ওয়াক্ফ বাতিল হয়েছে বলে তিনি জানান। মাজার পরিচালনার জন্য নিজের পরিবারসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি কমিটি গঠনের দাবি তাঁর।
অন্যদিকে, মাজারের আগের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে বর্তমান পক্ষের বিরোধ রয়েছে। জমি ও মাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই বিরোধের কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রম আর শুরু হচ্ছে না—এমনটাই বলছেন স্থানীয়রা। তবে বিরোধের সঙ্গে জড়িত সব পক্ষের বক্তব্য ও জমির আইনি অবস্থান যাচাই করা জরুরি।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—কোনো ব্যক্তি মাজারে অপরাধ বা অনিয়ম করলে তার দায় কি পুরো মাজারের? কোনো মাদ্রাসায় অপরাধের অভিযোগ উঠলে কি পুরো মাদ্রাসা ভেঙে ফেলা সমাধান হতে পারে? অপরাধের বিচার অবশ্যই আইনের মাধ্যমে হতে হবে। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের বিশ্বাস, শিক্ষা ও মানবিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া কি কোনো সমাধান? মাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাই প্রয়োজন বিরোধের সুষ্ঠু নিষ্পত্তি। জমি ও ওয়াক্ফের কাগজপত্র যাচাই, আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব এবং সব পক্ষের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য পরিচালনা কমিটি গঠন করা জরুরি।
কারণ এই মাজারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু মানুষের বিশ্বাস, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ, অসহায় মানুষের সহায়তা এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জীবিকা। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এসব কার্যক্রম আবারও চালু হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এখন প্রশ্ন একটাই—বিরোধের অবসান ঘটিয়ে কবে আবার ভক্ত- আশেকানদের পদচারণায় জমে উঠবে পোড়াবাড়ির এই মাজার?