শেখ কামরুল হাসান সাহা:: দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পনগরী গাজীপুরে এখন ভয়াবহ গ্যাস সংকট, অবৈধ সংযোগ ও দুর্নীতির জালে আটকে পড়েছে। শিল্পকারখানা, আবাসিক ভবন, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, ডাইং, ওয়াশিং ও ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিস্তার ঘটলেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে একদিকে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে বাড়ছে চাপ, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব।
তিতাস গ্যাস সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিনই প্রায় ২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি নিয়ে চলছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্পাঞ্চল। অথচ এই সংকটের মধ্যেও থেমে নেই অবৈধ গ্যাস সংযোগের রমরমা বাণিজ্য। বরং স্থানীয়দের অভিযোগ- প্রতিদিনই নতুন নতুন অবৈধ সংযোগ যোগ হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী, আরিচপুর, বৌ বাজার, পাগার, স্টেশন রোড, কলেজ গেইট, মিলগেইট, এরশাদ নগর, বোর্ড বাজার, চান্দনা চৌরাস্তা, শিববাড়ী, ভোগড়া, জয়দেবপুর, রাজেন্দ্রপুর, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, বাইমাইল, সফিপুর, মাওনা, পূবাইল, গাছা, দক্ষিণ সালনা, হোতাপাড়া, কালিয়াকৈর সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকা এবং সিটি কর্পোরেশনের ঘনবসতিপূর্ণ মহল্লাগুলোতে অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিস্তার সবচেয়ে বেশি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক বাসায় বৈধভাবে ১ বা ২টি চুলার অনুমোদন থাকলেও বাস্তবে সেখানে ৮ থেকে ১২টি পর্যন্ত চুলা ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, অনেক ভবনে বৈধ সংযোগের আড়ালে গোপনে পাইপলাইন টেনে একাধিক ফ্ল্যাট, ভাড়া ইউনিট ও ছোট কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এসব অতিরিক্ত চুলা ও লাইনের বিপরীতে স্থানীয় দালালদের মাসোহারা দিতে হচ্ছে নিয়মিত।
মাসোহারা দিলেই মিলছে গ্যাস সংযোগ:
এলাকাভিত্তিক একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু দালাল ও পাইপলাইন মিস্ত্রির মাধ্যমে অবৈধ সংযোগ নেওয়া হয়। সংযোগপ্রতি কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। এরপর মাসিক ভিত্তিতে আদায় করা হয় চাঁদা। অভিযোগ রয়েছে, এই টাকার একটি অংশ বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ-বাটোয়ারা হয়। বিশেষ করে টঙ্গী, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর ও বোর্ডবাজার এলাকার বহুতল ভবনগুলোতে বৈধ সংযোগের আড়ালে অবৈধভাবে অতিরিক্ত চুলা ব্যবহার এখন অনেকটাই প্রকাশ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, “মাসোহারা ঠিকমতো পৌঁছালে কোনো সমস্যা হয় না।
শিল্পাঞ্চলেও অবৈধ লাইনের ছড়াছড়ি শুধু আবাসিক নয়, শিল্পাঞ্চলেও অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। গাজীপুরের বিভিন্ন ডাইং, ওয়াশিং, গার্মেন্টস, ফুড প্রসেসিং ও ক্ষুদ্র শিল্পকারখানায় অনুমোদনের বাইরে অতিরিক্ত বার্নার ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে রাতের আঁধারে গোপনে নতুন লাইন স্থাপন করা হয়। বিশেষ করে টঙ্গীর আউচ পাড়ার মোল্লা বাড়ির তারা টেক্স গার্মেন্টসের পাশের ওয়াশিং ফ্যাক্টরিতে অবৈধ লাইন স্থাপন করা হয়েছে, পাশে রয়েছে আউচ পাড়া খাঁ পাড়া রোডে,খৈরতুল মদিনা পাড়াসহ আশপাশের এলাকা সমূহে অবৈধ গ্যাস সংযোগের মহোৎসব।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরে ২ হাজারের বেশি বড় শিল্পকারখানা রয়েছে। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, ছোট ও অনিবন্ধিত কারখানাসহ প্রকৃত সংখ্যা আরও কয়েক হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশই গ্যাসনির্ভর হওয়ায় সংকটের সুযোগে অবৈধ বাণিজ্য আরও বিস্তার লাভ করেছে।
জাতীয় গ্রিডে ভয়াবহ চাপ:
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ সংযোগের কারণে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এতে বৈধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও গ্রাহকরা প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ পাচ্ছেন না। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে ব্যয়, কমছে রপ্তানি সক্ষমতা। পর্ব ১