নিজস্ব প্রতিবেদক:: স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম। কিন্তু দুর্গম জনপদ ও উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য এই মৌলিক অধিকারটি প্রায়শই অধরা থেকে যায়। নদীমাতৃক বাংলাদেশের অনেক প্রান্তিক এলাকার মানুষ আজও আধুনিক চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত।
যোগাযোগ ব্যবস্থার অনুন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে সাধারণ মানুষ সামান্য চিকিৎসার জন্যও নানা দুর্ভোগের শিকার হন। এই বাস্তবতায় খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার গড়ইখালী ইউনিয়নের বাঁশাখালী নদীর তীরে চালু হয়েছে একটি বিশেষ উদ্যোগ। সৌদি অনুদানে এবং বাংলাদেশ সরকারের পরিচালনায় উপকূলীয় মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে চালু হলো একটি অত্যাধুনিক ভাসমান হাসপাতাল।
সোমবার (২ নভেম্বর) সকালে জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি খুলনা-৬ আসনের (কয়রা-পাইকগাছা) সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, ডা. সায়েম, অ্যাডমিন শাহ আলম, প্রজেক্ট ম্যানেজার ফিরোজ আক্তার, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর খুলনা জেলা কর্মপরিষদ সদস্য ও পাইকগাছা উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী মাওলানা আমিনুল ইসলাম, পাইকগাছা উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর মাওলানা বুলবুল হোসেন, উপজেলা সেক্রেটারি মো. আলতাফ হোসেন, গড়ইখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম কেরু, গড়ইখালী ইউনিয়ন জামায়াতের আমীর মো. কামরুল ইসলাম, গড়ইখালী ইউনিয়নে জামায়াত মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. আনিসুর রহমানসহ এলাকার বিভিন্ন পর্যায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ মানুষ।
তিন মাসব্যাপী পরিচালিত এই উদ্যোগ উপকূলের অবহেলিত মানুষের স্বাস্থ্যখাতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। গড়ইখালী ইউনিয়নের বাঁশাখালী নদীর তীর ঘেঁষে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি এক উৎসবমুখর ও প্রাণবন্ত পরিবেশে সম্পন্ন হয়। স্থানীয় অসহায় ও দরিদ্র মানুষ আশার আলো দেখতে ভিড় করেন নদীরপাড়ে।
উদ্বোধনের পর থেকেই হাসপাতালটি তার কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই ভাসমান হাসপাতালটি আগামী তিন মাস একটানা বাঁশাখালী নদীতে অবস্থান করবে। এই দীর্ঘ সময়জুড়ে এলাকার অসহায়, দরিদ্র ও প্রান্তিক রোগীদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বা নামমাত্র খরচে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হবে।
নদীবেষ্টিত উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। বর্ষাকালে বা দুর্যোগপূর্ণ সময়ে মূল শহরের হাসপাতালগুলোতে পৌঁছানো তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই ভাসমান হাসপাতালটি সরাসরি নদীর তীরে নোঙর করার ফলে দুর্গম চরাঞ্চল ও ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ খুব সহজেই হেঁটে বা নৌকায় এসে চিকিৎসা নিতে পারছেন। এখানে অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে সাধারণ রোগব্যাধি থেকে শুরু করে বিভিন্ন জটিল রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
গড়ইখালী ও এর আশপাশের এলাকাগুলো নদীভাঙন এবং ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাবঞ্চিত ছিল। মানসম্মত ক্লিনিক বা হাসপাতালের অভাবে সামান্য জ্বর, সর্দি কিংবা প্রসূতি মায়েদের জরুরি চিকিৎসার জন্য রোগীদের মাইলের পর মাইল পাড়ি দিতে হতো। অনেক সময় অর্থাভাব ও সময়মতো চিকিৎসার অভাবে সাধারণ রোগও মারাত্মক রূপ নিত।
সৌদি অনুদান ও সরকারের এই যৌথ উদ্যোগ সেই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা নিরসনে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। স্থানীয় সচেতন মহলের প্রত্যাশা, আগামী তিন মাস এই ভাসমান হাসপাতালটি কেবল চিকিৎসাসেয়াই দেবে না, বরং উপকূলের মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বিশেষ করে নারী ও শিশুরা যারা স্বাস্থ্যসেবা থেকে বেশি পিছিয়ে থাকে, তারা এই হাসপাতালের মাধ্যমে সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন। স্থানীয় গরিব মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে এবং তাদের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে এই ভাসমান হাসপাতালটি এক অনন্য আশীর্বাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
মানুষের কল্যাণে গৃহীত যেকোনো আন্তরিক উদ্যোগই সমাজ পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পাইকগাছার গড়ইখালীতে ভাসমান হাসপাতালের এই শুভযাত্রা প্রমাণ করে যে, সদিচ্ছা থাকলে দুর্গম অঞ্চলের মানুষের কাছেও রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুফল পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এমপির হাত ধরে সূচিত এই কার্যক্রম উপকূলীয় স্বাস্থ্যখাতে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। আগামী দিনগুলোতে এই ধরনের জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের প্রতিটি কোণায় চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষ স্বাস্থ্যসেবার আলো পাবে—এটাই সমগ্র দেশবাসীর প্রত্যাশা।