দেওয়ান মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, বিশেষ প্রতিবেদক:: বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব, বিএনপির চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। আজ মঙ্গলবার সকাল ৬টায় রাজধানীর বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগে তিনি গত ২৩ নভেম্বর থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
শেষ মুহূর্তে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সোমবার রাতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান দ্রুত হাসপাতালে ছুটে যান এবং মায়ের পাশেই অবস্থান করেন। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও তখন উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে জানানো হয়, শেষ সময়ে পরিবার পরিজনের সান্নিধ্যে থেকেই তিনি ইন্তেকাল করেন। পরে তারেক রহমান হাসপাতাল থেকে গুলশানের বাসভবনে ফিরে যান।
দেশের অন্যতম প্রভাবশালী এই নেত্রীর মৃত্যুর খবরে সারা দেশে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। সকাল থেকেই এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে বিএনপির নেতা-কর্মী, সমর্থক ও সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে। হাসপাতাল এলাকা পরিণত হয় শোক, নীরবতা ও শ্রদ্ধায় ভরা এক আবেগঘন প্রাঙ্গণে। জনসমাগম ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হাসপাতালের আশপাশে নিরাপত্তা জোরদার করে এবং ট্রাফিক বিভাগ সাধারণ মানুষকে গাড়ি দূরে রেখে আসার অনুরোধ জানায়।
খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে আগামীকাল বুধবার থেকে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজার দিন এক দিনের সাধারণ ছুটি থাকবে। ভাষণে তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতভেদ সত্ত্বেও বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও বহুদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিকাশে তাঁর ভূমিকা জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এভারকেয়ার হাসপাতালে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, এই ক্ষতি অপূরণীয় এবং দেশের রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানান, জানাজা ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে বিএনপি সাত দিনব্যাপী শোক কর্মসূচি পালন করবে। এ সময় নেতা-কর্মীরা কালো ব্যাজ ধারণ করবেন, দলের সব কার্যালয়ে শোকবই খোলা থাকবে এবং দেশব্যাপী দোয়া মাহফিল ও কোরআন খতমের আয়োজন করা হবে। এ উপলক্ষে আজ দুপুরে দলের স্থায়ী কমিটির একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথাও রয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বেগম খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজা আগামীকাল বুধবার রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত হতে পারে। পরে তাঁকে শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে তাঁর স্বামী, স্বাধীনতার ঘোষক ও সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে দাফন করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আন্তর্জাতিক পরিসরেও শোকের প্রতিক্রিয়া এসেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক মহল গভীর শোক প্রকাশ করেছে। নির্বাচন কমিশন এক শোকবার্তায় তাঁকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির একজন প্রভাবশালী ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর অবদানের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছে।
একজন গৃহবধূ থেকে দৃঢ়চেতা রাজনৈতিক নেত্রী হয়ে ওঠা বেগম খালেদা জিয়া প্রায় চার দশকের বেশি সময় ধরে দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা, সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বিরোধী রাজনীতিতে আপসহীন ভূমিকার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্ব, ত্যাগ ও সংগ্রাম জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।