June 17, 2026, 8:51 pm

হ্যাটট্রিকে ক্লোসাকে ছুঁয়ে মেসির নতুন ইতিহাস

Reporter Name
  • আপডেট Wednesday, June 17, 2026
  • 6 জন দেখেছে

স্পোর্টস ডেস্ক:: চার বছর আগে লুসাইল স্টেডিয়ামের সেই মহাকাব্যিক রাতের পর অনেকেই ভেবেছিলেন, লিওনেল মেসির বৃত্ত বোধহয় পূরণ হয়ে গেছে। ফুটবল বিধাতার কাছে যা চাওয়ার ছিল, তার সবকিছুই তো ধরা দিয়েছিল মরুভূমির বুকে। কিন্তু ফুটবল যার পায়ে কথা বলে, তার ক্ষুধা কি এত সহজে মেটে? ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের শিরোপা ধরে রাখার অভিযানে নেমে আলজেরিয়ার বিপক্ষে লিওনেল মেসি যা করলেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। কাতার বিশ্বকাপের রেশ ধরে রেখেই যেন উত্তর আমেরিকার মঞ্চে পা রাখলেন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা। মাঠে নামলেন, খেললেন এবং চিরচেনা জাদুতে প্রতিপক্ষকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে তুলে নিলেন বিশ্বকাপে নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিক!
মেসির এমন রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের দিনে আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। এই জয়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে মেসির রেকর্ডের খাতা। ম্যাচে তিন গোল করার পথে তিনি ছুঁয়ে ফেলেছেন বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসাকে।
মাইলফলকের ম্যাচ এবং একাদশের চমক:
ম্যাচটি মাঠে গড়ানোর আগেই ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে ছিল টানটান উত্তেজনা। আলজেরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামার সাথে সাথেই আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সিতে ২০০তম ম্যাচ খেলার এক অভূতপূর্ব মাইলফলক স্পর্শ করেন লিওনেল মেসি। ম্যাচের আগে কোচ লিওনেল স্কালোনি যখন একাদশ ঘোষণা করেন, তখন থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবলের ইঙ্গিত ছিল স্পষ্ট। তবে মাঠের লড়াইয়ে নামার আগে কিছুটা সতর্কও ছিলেন আলজেরিয়ানরা। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার ডাগআউটে ম্যাচের আগে বেশ কিছু কৌশলগত আলোচনা চলছিল, বিশেষ করে ডিফেন্ডার নাহুয়েল মলিনা এবং গঞ্জালো মন্তিয়েলকে নিয়ে। শেষ পর্যন্ত মন্তিয়েলকে দিয়ে ম্যাচ শুরু করলেও দ্বিতীয়ার্ধে মলিনা মাঠে নামেন।
প্রথমার্ধে মেসির পায়ের জাদু ও গোল বাতিল:
ম্যাচ শুরুর প্রথম বাঁশি বাজার পর থেকেই মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয় আলজেরিয়া ও আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা। তবে সব আলো কেড়ে নেন মেসি। ম্যাচের শুরুতেই একবার বল জালে জড়িয়ে উল্লাসে মেতে উঠেছিল আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা, কিন্তু অফসাইডের কারণে মেসির সেই গোলটি বাতিল করে দেন রেফারি। এর কিছুক্ষণ পর আলজেরিয়ার একটি আক্রমণ থেকেও গোল হয়েছিল, তবে সেটিও রেফারির নিয়মের বেড়াজালে বাতিল হয়ে যায়। তবে মেসিকে বেশিক্ষণ আটকে রাখা যায়নি। ম্যাচের ঠিক ১৭ মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। মাঝমাঠ থেকে রদ্রিগো দি পলের বাড়ানো চমৎকার এক পাস নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন মেসি। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ডি-বক্সের প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে বাম পায়ের এক চোখধাঁধানো শটে বল জড়ান জালে। আলজেরিয়ার গোলরক্ষকের কেবল চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। এই চোখধাঁধানো গোলের মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপে নিজের ১৪তম গোলটি উদযাপন করেন মেসি। প্রথমার্ধের বাকিটা সময়জুড়ে ছিল কেবলই আর্জেন্টিনার আধিপত্য, যার নেপথ্য কারিগর ছিলেন মেসি নিজেই। প্রথমার্ধ শেষ হয় ১-০ ব্যবধানে।
দ্বিতীয়ার্ধে আলজেরিয়ার ভুল এবং মেসির ১৫তম গোল:
দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতেই আর্জেন্টিনা শিবিরে আরও দুটি পরিবর্তন আনেন স্কালোনি। মাঠের গতি বাড়াতে মন্তিয়েলের বদলে মাঠে নামানো হয় মলিনাকে। এরই মধ্যে আর্জেন্টিনার লাউতারো মার্তিনেজের একটি দুর্দান্ত শট দারুণ দক্ষতায় প্রতিহত করেন আলজেরিয়ান গোলরক্ষক লুকা জিদান। তবে ম্যাচের ৬০ মিনিটে সেই লুকা জিদানই করে বসেন এক মারাত্মক ভুল।
আলজেরিয়ার রক্ষণভাগের দুর্বলতা এবং গোলরক্ষকের অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের সুযোগ নিতে ভুল করেননি আধুনিক ফুটবলের এই জাদুকর। ডি-বক্সের ভেতর বল পেয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় নিখুঁত ফিনিশিংয়ে নিজের দ্বিতীয় এবং বিশ্বকাপে নিজের ১৫তম গোলটি করেন মেসি। এই গোলের মাধ্যমে তিনি ছুঁয়ে ফেলেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার রোনালদো নাজারিওকে। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তখন পুরোপুরি আর্জেন্টিনার হাতে।
অপেক্ষার অবসান, বিশ্বকাপে প্রথম হ্যাটট্রিক এবং ক্লোসাকে স্পর্শ:
২-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর গ্যালারিতে থাকা হাজারো সমর্থক অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন মেসির হ্যাটট্রিকের জন্য। ম্যাচের ৮০ বা ৮২ মিনিটের দিকে একবার হ্যাটট্রিকের খুব কাছাকাছি গিয়েও অল্পের জন্য সুযোগ হাতছাড়া হয় তাঁর। কিন্তু ইতিহাস যার জন্য অপেক্ষা করছে, তাকে কি আর থামানো যায়? ম্যাচের ঠিক ৭৬ মিনিটে আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আলজেরিয়ার রক্ষণভাগকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়ে দারুণ এক দলীয় আক্রমণ থেকে বল পান মেসি। বিন্দুমাত্র ভুল না করে বল জালে জড়িয়ে উদযাপনে মাতেন তিনি। এই গোলের সাথেই পূর্ণ হয় বিশ্বকাপে তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিক। এর আগে চার-চারটি বিশ্বকাপ খেললেও কোনো ম্যাচেই হ্যাটট্রিক পাননি তিনি, ২০২৬ সালের এই মঞ্চেই ঘুচল সেই আক্ষেপ।শুধু হ্যাটট্রিকই নয়, এই গোলের মাধ্যমে মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম শীর্ষ রেকর্ডটি নিজের করে নেন। বিশ্বকাপে ১৬টি গোল করে জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডে যৌথভাবে ভাগ বসান মেসি। এখন আর মাত্র একটি গোল করলেই এককভাবে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে বসবেন তিনি।
দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন (স্ট্যান্ডিং ওভেশন):
রেকর্ড গড়ার ঠিক পরপরই অর্থাৎ ম্যাচের ৮০ মিনিটে কোচ লিওনেল স্কালোনি মেসিকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দীর্ঘ টুর্নামেন্টের কথা চিন্তা করে মেসিকে বিশ্রাম দেওয়াই ছিল কোচের মূল লক্ষ্য। তবে মেসি যখন মাঠ ছাড়ছিলেন, তখন স্টেডিয়ামের দৃশ্য ছিল দেখার মতো। গ্যালারিতে উপস্থিত আলজেরিয়া এবং আর্জেন্টিনা- উভয় দলের সমর্থকই দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে এই ফুটবল ঈশ্বরকে ‘স্ট্যান্ডিং ওভেশন’ জানান। এটি কেবল একজন ফুটবলারের মাঠ ছাড়ার দৃশ্য ছিল না, এটি ছিল একজন জীবন্ত কিংবদন্তির প্রতি ফুটবল বিশ্বের বিনম্র শ্রদ্ধা।
এক নজরে ২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী দিনগুলোর অন্যান্য ম্যাচ:
মেসি ও আর্জেন্টিনার এই রাজকীয় শুরুর পাশাপাশি চলতি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী দিনগুলোতে বেশ কিছু রোমাঞ্চকর ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
নরওয়ে বনাম ইরাক: তরুণ সেনসেশন আর্লিং হলান্ডের ‘শো’ দেখেছে ফুটবল বিশ্ব। ২৯ মিনিটে গোল করে নরওয়েকে এগিয়ে নেওয়ার পর ইরাক সমতায় ফিরলেও হলান্ডের জোড়া গোলে শেষ পর্যন্ত ৪-১ ব্যবধানের বড় জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে নরওয়ে।
ফ্রান্স বনাম সেনেগাল: কিলিয়ান এমবাপ্পের মাইলফলক ছোঁয়া ম্যাচে সেনেগালের সাথে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় ফ্রান্সের। এমবাপ্পের রেকর্ড গড়া গোল এবং বারকোলার বদলি নেমে করা গোলের ওপর ভর করে ম্যাচটি জমজমাট হয়ে ওঠে।
অন্যান্য অঘটন ও ড্র: এবারের বিশ্বকাপের শুরুটা হয়েছে চমক দিয়ে। উরুগুয়েকে আটকে দিয়েছে সৌদি আরব, ৬৮ বছর পর এক দিনে চারটি ম্যাচ ড্র হওয়ার রেকর্ড হয়েছে, এবং ইরানকে রুখে দিয়েছে নিউজিল্যান্ড। এছাড়া কেপ ভার্দে তাদের অভিষেক ম্যাচেই রুখে দিয়েছে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে।
ক্ষুধা এখনো ফুরিয়ে যায়নি:
আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের এই জয় দিয়ে আর্জেন্টিনা কেবল ৩টি পয়েন্টই অর্জন করেনি, বরং প্রতিপক্ষ দলগুলোকে একটি কড়া বার্তাও দিয়ে রাখল। কাতার বিশ্বকাপে অধরা ট্রফি জয়ের পর অনেকেই ভেবেছিলেন আর্জেন্টিনার হয়তো আর পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু স্কালোনির শিষ্যরা প্রমাণ করলেন, চার বছর আগের সেই ক্ষুধা এখনও বিন্দুমাত্র কমেনি। লিওনেল মেসি প্রমাণ করলেন, বয়স কেবলই একটি সংখ্যা। ৩৬ বা ৩৭ পেরুলেও তাঁর পায়ের জাদু এখনও বিশ্বকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতে পারে। ক্লোসার রেকর্ড ছোঁয়া এই মহাতারকা যেভাবে টুর্নামেন্ট শুরু করলেন, তাতে বলাই যায়- ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার এই যাত্রা কেবল শুরু, সামনে হয়তো আরও বড় কোনো ইতিহাস অপেক্ষা করছে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য।

সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই সম্পর্কিত আরও খবর