June 11, 2026, 1:14 am

টঙ্গীর শ্রমকল্যাণ কেন্দ্র দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর অবহেলায় পড়ে আছে নষ্ট হচ্ছে শত কোটির সরকারি সম্পদ

Reporter Name
  • আপডেট Wednesday, June 10, 2026
  • 17 জন দেখেছে

মো: জাফর আলী :: গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গীতে অবস্থিত শ্রমকল্যাণ কেন্দ্র। শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য এবং বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে অবহেলা, নিরাপত্তাহীনতা এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার এক নীরব সাক্ষীতে পরিণত হয়েছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে কামারপাড়া রোডের মাথায় অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ এ সরকারি স্থাপনাটি একসময় শ্রমিক কল্যাণের অন্যতম ভরসাস্থল হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে এর একটি বড় অংশ জরাজীর্ণ, অব্যবহৃত এবং কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ভবনের কোথাও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে, কোথাও জানালার কাচ ভাঙা, কোথাও ছাদের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত। ভবনের চারপাশে অযত্নে বেড়ে ওঠা ঝোপঝাড়, আগাছা এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ পুরো এলাকাটিকে আরও বেশি নির্জন ও অরক্ষিত করে তুলেছে। দিনের বেলায় কিছু কার্যক্রম পরিচালিত হলেও সন্ধ্যার পর পুরো এলাকার পরিবেশ বদলে যায় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত থাকা ভবনের বিভিন্ন অংশে সন্ধ্যার পর সন্দেহজনক ব্যক্তিদের আনাগোনা বাড়ছে। পরিত্যক্ত অংশে মাদকসেবন, জুয়ার আসরসহ বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়।
টঙ্গী শ্রমকল্যাণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করা। দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত শ্রমিকদের চিকিৎসাসেবা, মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা, শিশুস্বাস্থ্য এবং সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এ কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার কথা।
এ ছাড়া শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানায় গিয়ে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। প্রতি বছর সাধারণত ৮ থেকে ১০টি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়। পাঁচ দিনব্যাপী এসব প্রশিক্ষণে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য সচেতনতা, পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক কল্যাণবিষয়ক বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে এসব প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন। তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং সংস্কারের অভাবে প্রতিষ্ঠানটির পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ প্রতিষ্ঠানটি এখন ভাড়ায় অলমপিয়া রোড এলাকায় পরিচালিত হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে জনসংখ্যা ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা আসমা আক্তার এবং সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডা. ফেরদৌস আক্তারসহ ১১ কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। অনুমোদিত জনবল ১৩ জন হলেও বর্তমানে দুটি পদ শূন্য রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শিল্পাঞ্চলের বিপুল শ্রমিক জনগোষ্ঠীর তুলনায় এ জনবল অত্যন্ত সীমিত। ফলে সেবার পরিধি বৃদ্ধি এবং কার্যক্রম সম্প্রসারণে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিশাল এলাকাজুড়ে কার্যকর নিরাপত্তা প্রহরী নেই বললেই চলে। দীর্ঘদিন ধরে ভবনের বিভিন্ন অংশ অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকায় সরকারি সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অসাধু চক্রের দখলে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। রাতের বেলায় অনেক অপরিচিত ব্যক্তিকে পরিত্যক্ত ভবনের আশপাশে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শ্রমকল্যাণ কেন্দ্রটি প্রায় তিন বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে অবস্থানের কারণে জমিটির বাজারমূল্য বর্তমানে অত্যন্ত বেশি। এলাকাবাসী, ভূমি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, জমি ও স্থাপনার সম্মিলিত মূল্য ৩০০ কোটির টাকার বেশি হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে সরকারি কোনো আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন প্রকাশ করা হয়নি, তবুও এত মূল্যবান সরকারি সম্পদ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় পড়ে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সচেতন নাগরিকরা।
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত এমন একটি প্রতিষ্ঠানের এ অবস্থা শুধু প্রশাসনিক অবহেলারই প্রমাণ নয়, এটি সরকারি সম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। যেখানে শ্রমিকদের কল্যাণে আরও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম চালুর প্রয়োজন রয়েছে, সেখানে একটি বিদ্যমান সরকারি অবকাঠামোকে অযত্নে পড়ে থাকতে দেখা সত্যিই হতাশাজনক।
এ বিষয়ে টঙ্গী শ্রমকল্যাণ কেন্দ্রের সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডা. ফেরদৌস আক্তার বলেন, প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সংস্কার এবং সার্বিক পরিবেশ উন্নয়নের জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রণালয় ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে আবেদন জানিয়ে আসছি। ভবনের সংস্কার, নিরাপত্তা জোরদার এবং সেবার মানোন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ চেয়ে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আমরা আশাবাদী, দ্রুত বরাদ্দ পেলে শ্রমিকদের জন্য আরও উন্নত ও আধুনিক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র যুগ্ম সচিব সাহা আব্দুল তারেক বলেন, টঙ্গী শ্রমকল্যাণ কেন্দ্রের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সংস্কারসংক্রান্ত বিষয়টি বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব ও কারিগরি বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শ্রমিক কল্যাণের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির আধুনিকায়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে অবকাঠামোর প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়ন করার পাশাপাশি নিরাপত্তা জোরদার, সীমানা প্রাচীর সংস্কার, নিয়মিত টহল ব্যবস্থা চালু, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং পরিত্যক্ত অংশগুলো পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই সম্পর্কিত আরও খবর