May 15, 2026, 7:05 pm

গাজীপুরে এক সপ্তাহে ১১ হত্যাকাণ্ড, জনমনে আতঙ্ক

Reporter Name
  • আপডেট Friday, May 15, 2026
  • 17 জন দেখেছে

স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর :: গাজীপুরে এক সপ্তাহে একই পরিবারের ৫ জনসহ ১১ জনকে গলা কেটে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্তকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তারপরও থেমে নেই নৃশংসতা। সমাজের সচেতন নাগরিকেরা বলছেন, একের পর এক এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কারণে অনিরাপদ হয়ে যাচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রা। এসব হত্যাকাণ্ডের প্রভাব পড়ছে পরিবার থেকে সমাজ তথা রাষ্ট্রে। মানুষের মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক। পারিবারিক বন্ধনেও ফাটলের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
৮ মে দিবাগত রাতে কাপাসিয়া উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের রাউৎকোনা গ্রামে নৃশংসভাবে খুন করা হয় একই পরিবারের শিশুসহ পাঁচজনকে। তাঁরা হলেন শারমিন খানম (৩৫), তাঁর তিন কন্যা মিম (১৬) মারিয়া (৮) ফারিয়া (২) ও শারমিনের ছোট ভাই রসুল মোল্লা (২২)। এই ঘটনার মূল সন্দেহভাজন শারমিন খানমের স্বামী ফোরকান ঘটনার পর থেকে পলাতক।
এর পরদিন ৯ মে সন্ধ্যার দিকে উপজেলার প্রহলাদপুর ইউনিয়নের ফাওগান বাজারে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে ষাটোর্ধ্ব এক বিএনপি নেতাকে সালিসে ডেকে নিয়ে ইউপি সদস্যের নেতৃত্বে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। মারধরের দুই দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। নিহত জয়নাল আবেদীন উপজেলার প্রহলাদপুর ইউনিয়নের ফাওগান গ্রামের মৃত নইমুদ্দিনের ছেলে। তিনি প্রহলাদপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ছিলেন।
১০ মে কালিয়াকৈর উপজেলার ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের বাগচালা গ্রামে গরুচোর সন্দেহে তিনজনকে পিটিয়ে খুন করে বিক্ষুব্ধ জনতা। এ সময় তাঁদের ব্যবহৃত একটি ট্রাকও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। একটি মামলা দায়ের করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা। পুলিশ বাদী হয়ে আরেকটি হত্যা মামলা দায়ের করে, যেখানে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এরপর ১২ মে গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানার ওঝারপাড়া গ্রামের মহরের বাড়ি-সংলগ্ন এলাকায় শুভ নামের এক অটোরিকশাচালককে গলা কেটে হত্যার পর অটোরিকশা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। নিহত শুভ নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী গ্রামের আমির মিয়ার ছেলে। তিনি গাজীপুর মহানগরীর শরীফপুর এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে অটোরিকশা চালাতেন।
বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলার রাজাবাড়ি ইউনিয়নের ডোয়াইবাড়ি গ্রামের বগারভিটা এলাকার গজারিবনের ভেতর থেকে মেহেদী হাসান আসিফ নামের এক অটোরিকশাচালকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত মেহেদী হাসান (২২) উপজেলার রাজাবাড়ি ইউনিয়নের ডোয়াইবাড়ি গ্রামের মো. হুমায়ুন আহমেদ জাকিরের ছেলে। তিনি পেশায় অটোরিকশাচালক ছিলেন।
এভাবে প্রায় প্রতিদিন কোনো না কোনো হত্যাকাণ্ডের সংবাদ পাচ্ছেন এলাকাবাসী। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এমন পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বোধ করছেন তাঁরা। সন্তানদের স্কুলে বা বাইরে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই মনে হয়, না জানি কোন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা শুনতে হয়।
এ বিষয়ে কলেজ শিক্ষক মনিরুল কবির বলেন, ‘আইনের প্রতি মানুষের আস্থার অভাব তৈরি হয়েছে। এ কারণে মানুষ সহনশীলতা হারিয়েছে। এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। সামাজিক অস্থিরতা দূর করতে হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক বন্ধনে ফাটল দেখা দিলে এমন অপরাধ বেশি হয়। তিনজনকে পিটিয়ে মেরে ফেলার আগে একবারও কেউ ভাবেননি, এসব মানুষের সংসার, স্ত্রী-সন্তান রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবারগুলোতে নৈতিকতার শিক্ষা ও চর্চা বাড়াতে হবে।’
ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান অসীম বিভাকর বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে, আমরা যথাযথ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠছি না। আমাদের মধ্যকার সুকুমারবৃত্তিগুলো লোপ পেয়ে আমরা ক্রমেই প্রবৃত্তির বশীভূত হয়ে যাচ্ছি। যার কারণে আমরা হিংস্র হয়ে এই কাজগুলো খুব সহজে করে ফেলছি। আমাদের মধ্যে অপরাধ বোধ কাজ করছে না মাদক গ্রহণের কারণে। এ জন্য এত খুনোখুনি, হানাহানি।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে গাজীপুর পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দিন বলেন, ‘মাদকের ব্যবহার এর অন্যতম কারণ। মাদকের ভয়াবহতা খুবই মারাত্মক। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি যেকোনো ধরনের অপরাধ করতে পারেন। তাঁর বিবেক কাজ করে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সামাজিকভাবে এগুলোর মোকাবিলা করতে হবে। সন্ধ্যার পর আপনার আমার সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে চলে এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যে এগুলোর রহস্য উদ্‌ঘাটন করা হবে এবং অপরাধীর সাজা নিশ্চিত হবে।

সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই সম্পর্কিত আরও খবর