July 9, 2026, 11:11 am

গাজীপুরে ‘ঠাকুরদাস সিন্ডিকেট’ আতঙ্কে ভূমি মালিকরা

Reporter Name
  • আপডেট Monday, October 6, 2025
  • 99 জন দেখেছে

স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুরঃ গাজীপুর মহানগরের গাছা থানার পলাশোনা এলাকায় রাজনৈতিক পরিচয়ের রঙ বদলে গড়ে উঠেছে এক ভয়ঙ্কর ভূমিদস্যু চক্র— স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘ঠাকুরদাস সিন্ডিকেট’ নামে। একসময় আওয়ামী শ্রমিক লীগ নেতা আবুল কাশেমের নেতৃত্বে সক্রিয় এই চক্র এখন তার ছোট ভাই সালামের নেতৃত্বে বিএনপির ব্যানার ব্যবহার করে জমি দখল, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগী আনোয়ারুল মামুন জানান, তাঁর পিতা মরহুম আবদুল জব্বার ভূঁইয়া ১৯৭৫ সালে ৪ দশমিক ২১ একর জমি ক্রয় করে নামজারি ও জমাভাগ সম্পন্ন করেন। নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করে তারা দীর্ঘদিন জমিটি ভোগদখল করে আসছেন। পিতার মৃত্যুর পর দুই বোন তাঁদের অংশ বিক্রির উদ্যোগ নিলে এলাকার একটি দালাল চক্র জমির কাগজপত্র নিয়ে যায়। এরপর ‘ঠাকুর দাস মণ্ডল’ নামে এক মৃত ব্যক্তিকে ক্রেতা দেখিয়ে ওই জমির ওপর জাল দলিল (নং–৩৬৪৮) তৈরি করা হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে কাশেমের নেতৃত্বে থাকা চক্রটি ঠাকুর দাসের নামে পুকুরের মালিকানা দাবি করে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে জবরদখল চালায়। এ ঘটনায় আনোয়ারুল মামুন গাছা থানায় জিডি করলেও জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্যে দলিলটির কোনো অস্তিত্ব মেলেনি। এমনকি মৃত ঠাকুর দাসের নামে জাল জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে চক্রটি আদালতে মামলা (নং–৩২৫/২০২৩) দায়ের করে, যেখানে মামলার আরজিতে বলা হয়, আসামিরা বাদীর জমি দখল করে গাছ কেটেছে ও কেয়ারটেকারকে মারধর করেছে। তদন্তে সিআইডি ‘ঘটনার সত্যতা পেয়েছে’ উল্লেখ করলে প্রকৃত জমি মালিকপক্ষের দুই প্রতিনিধি গ্রেফতার হয়ে কারাভোগ করেন।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পলাশোনায় ঠাকুর দাস নামে কোনো ব্যক্তি অতীতে বা বর্তমানে ছিলেন না। বিষয়টি নিশ্চিত করে ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইকবাল হোসেন মোল্লা লিখিত প্রত্যয়নপত্রে জানান, “এই এলাকায় ঠাকুর দাস নামে কোনো ব্যক্তি কখনো ছিলেন না, এখনো নেই।” স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা আলাউদ্দিন বলেন, “যে পুকুরের মালিকানা ঠাকুর দাসের নামে দাবি করা হচ্ছে, সেটি মরহুম আবদুল জব্বার সাহেবের পরিবারের।”

স্থানীয়দের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কাশেমের নেতৃত্বে দখল, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসায় প্রভাব বিস্তার করত এই চক্রটি। সরকার পরিবর্তনের পর তার ভাই সালাম বিএনপির যুব সংগঠনে যোগ দিয়ে একই কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। সালাম বর্তমানে গাছা থানা যুবদলের ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি তাঁর নেতৃত্বেই পুকুরপাড়ের গাছপালা কেটে নেওয়া হয়। শ্রমিক মাইদুল জানান, “সালাম ভাই আমাদের গাছ কাটতে বলেছেন।” তবে সালাম দাবি করেন, “আমি ঠাকুর দাসের কাছ থেকে গাছগুলো কিনেছি,” যদিও ঠাকুর দাসকে চেনেন না বলে স্বীকার করেন।

ভুক্তভোগী আনোয়ারুল মামুন বলেন, “জাল কাগজ ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে আমাদের জমি দখলের চেষ্টা চলছে। আমরা পরিবারসহ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি।” স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কারণেই দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেটটির বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

এলাকার সাধারণ মানুষের আশঙ্কা, ‘ঠাকুরদাস সিন্ডিকেট’ এখন পলাশোনায় দখলবাণিজ্যের নতুন প্রতীক হয়ে উঠেছে। অতীতে আওয়ামী আমলে নীড় হাউজিং নামের একটি কোম্পানি বিস্তীর্ণ আবাদি জমি বাউন্ডারি দিয়ে দখল করে ‘গাজীপুর এগ্রো’ নামে নতুন সাইনবোর্ডে ফের সক্রিয় হয়। এখন সেই একই প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও ‘ঠাকুরদাস সিন্ডিকেট’ হাত মিলিয়ে আবারও নতুন রূপে আবির্ভূত হচ্ছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই সম্পর্কিত আরও খবর