August 24, 2026, 1:16 pm

বর্তমান প্রজন্মের ভবিষ্যৎ মাদকের ছোবলে থমকে যাচ্ছে!

Reporter Name
  • আপডেট Monday, August 24, 2026
  • 23 জন দেখেছে

মো: মুর্শিকুল আলম:: বর্তমানে দেশের মেধা ও সম্ভাবনায় উজ্জ্বল এসব তরুণ-তরুণীর অনেকের ভবিষ্যৎ এখন মাদকের ছোবলে থমকে গেছে। মাদকাশক্তদের অনেকে প্রকৌশলী, ব্যারিস্টার, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র। তাদের মধ্যে অনেকের বাবা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ কোটিপতি ব্যবসায়ী কিংবা প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিকের সন্তান।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাজধানীর কয়েকটি অভিজাত মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এমন অনেক ভিআইপি পরিবারের সন্তান। কেউ বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশে ফিরে মাদকে জড়িয়েছেন, কেউ প্রতিষ্ঠিত পেশায় থেকেও নেশার কারণে হারিয়েছেন কর্মজীবন। আবার অনেকে দীর্ঘদিন মাদক সেবনের ফলে ভুগছেন মানসিক ও শারীরিক নানা জটিলতায়।
রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত আইকন কেয়ার নামের একটি অভিজাত নিরাময়কেন্দ্রে চলতি মাসে ২৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন একটি শিল্পগ্রুপের কর্ণধার ও এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক। তিনি অ্যালকোহল ও ইয়াবায় আসক্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ২৬ বছর বয়সী এক তরুণী।
ধনাঢ্য পরিবারের এ তরুণী সদ্য লন্ডন থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে দেশে ফিরেছেন। কিন্তু মাদকাসক্তির কারণে আইন পেশায় যুক্ত হতে পারেননি। পরে পরিবার তাকে নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি করে। একই কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ৪৪ বছর বয়সী এক নারী। স্বামীর প্ররোচনায় অ্যালকোহলে আসক্ত হয়ে পড়েন তিনি।
মাদকের কারণে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পড়াশোনাও থেমে গেছে এক তরুণের। চীনে চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়তে গিয়ে মাদকে জড়িয়ে পড়েন তিনি। একপর্যায়ে চরম মাদকাসক্ত হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারান। পড়াশোনা শেষ না করেই দেশে ফিরে আসেন। ঢাকায় ফেরার পরও নেশা থেকে বের হতে পারেননি। দীর্ঘদিন ধরে নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি।
একজন প্রকৌশলীর অবস্থাও করুণ। ইউরোপের একটি নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি নেওয়া এই ব্যক্তি দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে বসবাস করেছেন। ফেডিডাস্ট, কোকেনসহ বিভিন্ন ধরনের পাশ্চাত্য মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েন তিনি। দীর্ঘদিন মাদক সেবনের কারণে তার শরীরে নানা জটিল রোগ দেখা দিয়েছে। রাজধানীর ট্রাস্ট কলেজের এক শিক্ষার্থীও মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার বাবা প্রতিষ্ঠিত গার্মেন্ট ব্যবসায়ী।
গাজীপুরের ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি) থেকে পাস করা এক প্রকৌশলীও গাঁজার নেশায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদে কর্মরত ছিলেন তিনি। মাদকের কারণে তার পেশাজীবনও থমকে গেছে।
ইয়াবায় আসক্ত আরেক তরুণের বাবা পুলিশ কর্মকর্তা এবং মা ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা। উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা দম্পতির এই সন্তানকে নিয়ে পুরো পরিবার এখন বিপর্যস্ত। দীর্ঘদিন মাদক সেবনের কারণে তার চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী এক যুবকও মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি দেশটির একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। মাদকে জড়িয়ে পড়ার পর তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। চিকিৎসায় কিছুটা সুস্থ হলেও তার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়া এখন অনিশ্চিত। কারণ, ডোপ টেস্টে আবার মাদকাসক্তির প্রমাণ মিললে সেখানে তার স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।ানমণ্ডির শুক্রাবাদ এলাকার এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তানও ইয়াবায় আসক্ত হয়ে নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি হয়েছেন। এর আগে তাকে একাধিকবার চিকিৎসা দেওয়া হলেও সুফল মেলেনি। দীর্ঘদিনের মাদক সেবনে তার শরীরে নানা জটিলতা দেখা দিয়েছে।
রাজধানীর একটি নামকরা রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের মালিকের একমাত্র ছেলেও মাদকাসক্ত। দীর্ঘদিন মাদক সেবনের কারণে তার মধ্যে মানসিক রোগের লক্ষণ দেখা দিয়েছে। বর্তমানে তার সিজোফ্রেনিয়াসহ গুরুতর মানসিক জটিলতার চিকিৎসা চলছে।
এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর মাদকাসক্তির পেছনেও রয়েছে দীর্ঘদিনের নিঃসঙ্গতা। দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে সন্তান না হওয়া এবং পরে দাম্পত্য কলহের জেরে স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে তার। একপর্যায়ে চরম নিঃসঙ্গতা থেকে মাদকে জড়িয়ে পড়েন তিনি। বর্তমানে নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ সে তুলনায় বাড়েনি। দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৮০ লাখের বেশি হলেও ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছেন মাত্র ২ লাখ ৩০ হাজার জন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ, পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়া, একাকিত্ব, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং অঢেল অর্থবিত্তের কারণে অনেকে মাদকের দিকে ঝুঁকছেন। শিক্ষার অভাব ও মাত্রাতিরিক্ত স্বাধীনতাও এর পেছনে ভূমিকা রাখছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে শুধু চিকিৎসার আওতায় আনলেই হবে না; দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, পুনর্বাসন ও পরিবারের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে পুনরায় মাদকে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই সম্পর্কিত আরও খবর