নিজস্ব প্রতিবেদক :: গত ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত সাড়ে পাঁচ মাসে শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত সাভার, আশুলিয়া, ধামরাই ও গাজীপুরে ৬৮টি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর অধিকাংশই তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে ৫৮টি স্থায়ীভাবে এবং ১০টি সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। এসব কারখানায় কাজ করতেন প্রায় অর্ধলক্ষাধিক শ্রমিক। বেকার হওয়া এসব শ্রমিক এখন সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। উচ্চমূল্যের এই বাজারে তাদের বুক চাপড়ানো ছাড়া আর কিছুই করার নেই বলে জানান।
কারখানা বন্ধের বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষমতার পালাবদলে অনেকে দেশে ছেড়ে পালিয়েছেন, কেউ গ্রেপ্তার হয়ে কারগারে আছেন। এ ছাড়া খেলাপি ঋণ নিয়ে বর্তমান সরকার কড়াকড়ি আরোপ করায় অনেক কারখানা খেলাপি হয়ে পড়েছে।
শিল্প পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, বন্ধ হওয়া ৬৮ কারখানার মধ্যে গাজীপুরে ৫১টি এবং সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ে ১৭টি। এসব কারখানার শ্রমিকরা প্রতিদিনই কারখানা খুলে দেওয়া এবং বকেয়া বেতনের দাবিতে রাস্তায় নেমে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে প্রায়ই বন্ধ থাকছে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়ক। তাতে ভোগান্তি বাড়ছে যাত্রীসাধারণের।
শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত গাজীপুরে স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে বন্ধ তৈরি পোশাক কারখানার মধ্যে রয়েছে মহানগরীর সারাব এলাকার বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ১৬টি, টঙ্গীর সাতাইশ এলাকার টিএমএস অ্যাপারেলস, চন্দ্রা এলাকার নায়াগ্রা টেক্সটাইল, মাহমুদ জিনস ও হার্ডি টু এক্সেল, কোনাবাড়ীর পলিকন লিমিটেড, অ্যাপারেল প্লাস, টিআরজেড ও দি ডেল্টা নিট অন্যতম।
গাজীপুরের টিএমএস অ্যাপারেলস কারখানায় ৪ বছর ধরে কাজ করেছেন জামালপুরের হোসনা আক্তার। তিনি বলেন, ‘কাজ হারিয়ে দুই সন্তান নিয়ে এখন মানবেতর জীবন পার করছি। চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছি কোথাও হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে মানুষের কাছে হাত পাততে হবে।’
পলিকন লিমিটেড কারখানায় চাকরি করতেন জামেলা। তিনি বলেন, ‘বন্ধ হওয়া কারখানার পুরুষ শ্রমিকরা কাজ পেলেও নারীরা পাচ্ছেন না। বর্তমানে বাজারের যে অবস্থা তাতে চারজনের সংসার চালোনো কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সরকারের কাছে অনুরোধ আমাদের যেন একটা ব্যবস্থা করেন।’
গত ২১ জানুয়ারি বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের বন্ধ হওয়া সব কারখানা খুলে দেওয়ার দাবিতে গণসমাবেশ করেছেন ১৬ কারখানার প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক। বিশাল এই সমাবেশ থেকে কারখানা খুলে দিতে ৪৮ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়েছেন তারা।
শ্রমিক নেতা ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকারের রোষানলে পড়ে বিশাল শ্রমিক গোষ্ঠী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। তাই কারখানা খুলে না দেওয়া পর্যন্ত তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। যদিও সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে বলা হয়, বেক্সিমকোর দায়ভারে কারখানা বন্ধ হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির দায় নিতে গিয়ে বেশ কয়েকটি ব্যাংকও দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব এ এইচ এম শফিকুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে সতর্ক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, শ্রমিকদের আগে থেকে কিছু না জানিয়ে একের পর এক কারখানা বন্ধ হচ্ছে। কাজ হারিয়ে এসব শ্রমিক এখন মানবেতর জীবন পর করছেন। তাই সংশ্লিষ্টদের কাছে অনুরোধ তারা যেন এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেন।
তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক কারখানার মালিক গা ঢাকা দিয়েছেন। এ জন্য কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর বাইরে যেসব কারখানা বন্ধ হয়েছে সেগুলো উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে রুগণ হয়ে পড়েছে। তবে এসব কারখানার ক্রয়াদেশ অন্য কারখানা নিতে পারছে।