July 4, 2026, 12:58 pm

গাজীপুরে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে কুপিয়ে হত্যা, সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড়, গ্রেপ্তার হয়নি মূল ঘাতকরা

Reporter Name
  • আপডেট Friday, August 8, 2025
  • 73 জন দেখেছে

দেওয়ান মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বিশেষ প্রতিবেদক:: গাজীপুর মহানগরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের হামলায় নিহত হয়েছেন সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন (৩৮)। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে আটটার দিকে প্রকাশ্যে এ নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে। তিনি ‘দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ’-এর গাজীপুর প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।
ঘটনার সময় তুহিন এলাকার এক ব্যক্তিকে সন্ত্রাসীরা ধাওয়া করছিল। সেই দৃশ্য তিনি মোবাইল ফোনে ভিডিও করছিলেন। পুলিশ জানায়, ভিডিও করার বিষয়টি টের পেয়ে দুর্বৃত্তরা তাকে পিছু ধাওয়া করে। প্রাণ বাঁচাতে তিনি দৌড়ে ঈদগাঁ মার্কেট এলাকার একটি চায়ের দোকানে ঢুকলেও ঘাতকরা সেখানেই ঢুকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে ঘটনাস্থল সংলগ্ন একটি দোকানের সিসিটিভি ফুটেজে পুরো দৃশ্য ধরা পড়ে। ভিডিওটিতে হামলাকারীদের চেহারা স্পষ্টভাবে দেখা গেলেও এখনো মূল ঘাতকদের কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।
নিহতের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামে। তিনি ছিলেন সাত ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট। স্থানীয় আল-হেরা একাডেমি থেকে মাধ্যমিক এবং সিলেটের এম সাইফুর রহমান কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর তিনি গাজীপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি ও একটি ক্লিনিক পরিচালনার পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন। গাজীপুরে স্ত্রী মুক্তা বেগম ও দুই পুত্রসন্তানকে নিয়ে বসবাস করছিলেন তিনি।
মর্মান্তিক এই হত্যাকাণ্ডের খবরে সাংবাদিক তুহিনের গ্রামের বাড়ি ভাটিপাড়ায় শোকের ছায়া নেমে আসে। শুক্রবার দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির সামনে স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। তুহিনের বাবা হাসান জামাল বারবার বলছিলেন, “আমার ছেলেডারে ক্যান এমন কইরা মারল? কী অপরাধ করছিলো আমার ছেলে? দুই দিন আগেই যে ওষুধ কেনার টাকা পাঠাইলো, সেই ছেলে আজ লাশ হয়ে ফিরল!”


ঘটনার পর রাতেই গাজীপুর মহানগর পুলিশ অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন হিসেবে পাঁচজনকে আটক করে। তবে সিসিটিভি ফুটেজে যাদের অস্ত্র হাতে দেখা গেছে, তাদের কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। বাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহিন খান জানান, তদন্তের স্বার্থে আটককৃতদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা যাচ্ছে না। আজ শুক্রবার সকালে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে তুহিনের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। জুমার নামাজের পর চান্দনা ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষে তার মরদেহ ভাটিপাড়া গ্রামে নিয়ে গিয়ে দাফন করা হয়।
সাংবাদিক হত্যার প্রতিবাদে গাজীপুর প্রেসক্লাবের সামনে শুক্রবার সকালে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে গাজীপুর সাংবাদিক ইউনিয়ন। সভায় সাংবাদিক নেতারা বলেন, সিসিটিভিতে দৃশ্যমান ঘাতকদের গ্রেপ্তার করতে না পারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা। তারা দ্রুত জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
এদিকে, নিহত সাংবাদিকের নিজ এলাকা ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া এবং পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতেও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। ফুলবাড়িয়া উপজেলা পরিষদের সামনে ফুলবাড়িয়া প্রেসক্লাবের ব্যানারে মানববন্ধনে স্থানীয় সাংবাদিকরা অংশ নেন এবং তুহিন হত্যার তীব্র নিন্দা জানান। খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশেও সাংবাদিক নেতারা সরকারের সমালোচনা করে বলেন, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
‘দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ’-এর সম্পাদক খায়রুল আলম বলেন, “তুহিনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। একজন নিরীহ সাংবাদিক শুধু ভিডিও করার কারণে নির্মমভাবে খুন হলেন। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানাই।” একজন পেশাদার, দায়িত্বশীল ও সাহসী সাংবাদিককে প্রকাশ্যে হত্যা দেশের সাংবাদিকতা পেশার জন্যই এক ভয়াবহ বার্তা। এই নির্মম হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে, এখনও সাংবাদিকরা নিরাপদ নন। দ্রুত বিচার ও ঘাতকদের শাস্তিই পারে এ ঘটনার সঠিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে।

সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই সম্পর্কিত আরও খবর