July 6, 2026, 10:29 am

বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ফাতেমা বেগম ছিলেন ছায়ার মতো সঙ্গী

Reporter Name
  • আপডেট Wednesday, December 31, 2025
  • 175 জন দেখেছে

মো: মুর্শিকুল আলম:: রাজনীতি মানেই আমরা সাধারণত ভাবি—নেতৃত্ব, আন্দোলন, স্লোগান, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, আদালত আর কারাগারের গল্প। কিন্তু এই দৃশ্যমান ইতিহাসের আড়ালে থেকে যায় কিছু অদৃশ্য মানুষের জীবন, যাদের উপস্থিতি ছাড়া অনেক ইতিহাসই অসম্পূর্ণ থেকে যেত। তেমনই এক নীরব মানুষের নাম ফাতেমা বেগম—যিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থেকেও বাংলাদেশের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী হয়ে রইলেন।
বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া–এর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ফাতেমা বেগম ছিলেন ছায়ার মতো সঙ্গী। কোনো মাইক তার দিকে ধরা হয়নি, কোনো মঞ্চে তার নাম ঘোষণা করা হয়নি, তবু সংকটের প্রতিটি মুহূর্তে তিনি ছিলেন সবচেয়ে কাছের মানুষ।
গ্রাম থেকে সংগ্রামের পথে:
ফাতেমা বেগমের জন্ম ভোলার সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের শাহ-মাদার গ্রামে। পাঁচ সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে ছোটবেলা থেকেই দায়িত্ববোধ ছিল তার নিত্যসঙ্গী। কৃষক পরিবারে জন্ম, সীমিত আয়, কঠিন বাস্তবতা—সব মিলিয়ে জীবন তাকে খুব দ্রুত বড় করে দেয়।
বিয়ের পর স্বামী মো. হারুন লাহাড়ির সঙ্গে মেঘনা নদীর চরে কৃষি কাজ করেই চলছিল সংসার। তাদের ঘরে আসে দুই সন্তান—এক মেয়ে ও এক ছেলে। কিন্তু সুখের সেই অধ্যায় দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০০৮ সালে, ছেলের বয়স মাত্র দুই বছর, স্বামীকে হারান ফাতেমা। মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে তার পৃথিবী।
দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে গেলেও দারিদ্র্য যেন পিছু ছাড়েনি। মুদি দোকানি বাবার সামান্য আয়ে পুরো পরিবারের ভার বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখনই জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তটি নেন ফাতেমা—সন্তানদের গ্রামে রেখে কাজের সন্ধানে পাড়ি জমান ঢাকায়।
গৃহকর্মী থেকে ছায়াসঙ্গী:
২০০৯ সালে এক পূর্বপরিচিত মানুষের মাধ্যমে কাজ পান খালেদা জিয়ার বাসভবনে। শুরুটা ছিল সাধারণ গৃহকর্মীর মতোই। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব আর বিশ্বাসের সম্পর্ক বদলে দেয় পরিচয়ের সীমা। তিনি হয়ে ওঠেন একান্ত সহচর। খালেদা জিয়ার দৈনন্দিন জীবন, অসুস্থতা, মানসিক চাপ—সবকিছুর নীরব সাক্ষী ছিলেন ফাতেমা। ওষুধ খাওয়ানো, চলাফেরায় সহায়তা, নিঃসঙ্গ রাতগুলোতে পাশে বসে থাকা—এই কাজগুলো তার কাছে কেবল চাকরি ছিল না, ছিল মানবিক দায়।
আন্দোলন, কারাগার আর অবিচল সাহস:
২০১৪ সালের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচির সময় গুলশানের বাসভবনের সামনে বালুভর্তি ট্রাক দিয়ে পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেদিন পুলিশের চাপ আর উত্তেজনার মুহূর্তে যখন খালেদা জিয়া শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন, তখন ক্যামেরার আড়ালে নীরবে তার হাত শক্ত করে ধরে ছিলেন ফাতেমা। সেই দৃশ্য অজান্তেই ধরা পড়ে যায় ক্যামেরার ফ্রেমে—মানবিকতার এক অনুচ্চারিত ছবি।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি, আদালতের রায়ে খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে আইনজীবীদের আবেদনে ফাতেমা বেগমও আদালতের অনুমতি নিয়ে তার সঙ্গে কারাগারে প্রবেশ করেন। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াই তিনি হয়ে ওঠেন স্বেচ্ছা কারাবন্দি। নাজিমুদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারের অন্ধকার দিনগুলোতে তিনি শুধু গৃহকর্মী নন, ছিলেন ভরসার নাম।
মহামারি করোনার মধ্যেও ছিলেন ছায়া হয়ে:
২০২১ সালের করোনা মহামারির ভয়াবহ সময়ে, যখন মানুষ আপনজনের কাছেও যেতে ভয় পাচ্ছিল, তখন ৫৩ দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার পাশে অবিচলভাবে ছিলেন ফাতেমা। সেই সময় তিনি ছিলেন সেবিকা, সাহস আর আশ্বাস—সব একসঙ্গে।
সবশেষ লন্ডনে উন্নত চিকিৎসার সময়ও খালেদা জিয়ার সঙ্গে ছিলেন এই নীরব মানুষটি। বিদেশ সফর, হাসপাতালের করিডর, নিঃসঙ্গ রাত—সবখানেই তার উপস্থিতি ছিল অবিচ্ছেদ্য।
কোনো পদ নয়, তবু ইতিহাসের অংশ: 
ফাতেমা বেগম কোনো রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না। তার হাতে ছিল না কোনো ক্ষমতা, মুখে ছিল না কোনো স্লোগান। তবু ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলোতে তিনি ছিলেন অপরিহার্য। রাজনীতির কোলাহলের ভিড়ে তিনি রয়ে গেলেন এক নীরব নাম। কিন্তু সেই নীরবতাই তাকে আলাদা করে চিহ্নিত করে। ফাতেমা বেগম প্রমাণ করে গেছেন—সব সম্পর্ক ক্ষমতার নয়, কিছু সম্পর্ক গড়ে ওঠে দায়িত্ব, মানবিকতা আর নিঃশর্ত বিশ্বাসে। এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস শুধু নেতাদের দিয়ে লেখা হয় না। ইতিহাস বাঁচিয়ে রাখেন সেই সব নীরব মানুষরা—যারা আলোয় না থেকেও সব আলোকে সম্ভব করে তোলেন।

সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই সম্পর্কিত আরও খবর