নিজস্ব প্রতিবেদক :: ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ‘ভুলবশত’ হত্যা মামলার তিন আসামিকে মুক্তি দেওয়ার ঘটনায় প্রশাসনিক অঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গুরুতর এই ঘটনায় প্রাথমিকভাবে দায়ী হিসেবে কারাগারের এক ডেপুটি জেলারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কারা অধিদপ্তর।
কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনজন হত্যা মামলার আসামিকে মুক্তি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তে নামে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, আসামিদের মুক্তির ক্ষেত্রে গুরুতর প্রশাসনিক ভুল হয়েছে।
ঘটনার পরপরই প্রাথমিকভাবে দায়ী হিসেবে ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার জাকারিয়া ইমতিয়াজকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই দিনে ঢাকা বিভাগ–২-এর ডিআইজি প্রিজন্স টিপু সুলতানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ময়মনসিংহ বিভাগের কারা উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন্স) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, আসামিদের মুক্তির পেছনে মূলত একটি মারাত্মক নথিগত ভুল দায়ী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আদালতের প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট বা হাজিরা পরোয়ানাকে ভুলবশত জামিননামা হিসেবে বিবেচনা করে ওই তিন আসামিকে মুক্তি দেওয়া হয়।
তিনি আরও জানান, ডেপুটি জেলার অসতর্কতার কারণেই এই ভুলটি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এটি নিছক ব্যক্তিগত ভুল নাকি এর পেছনে আরও কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সম্পৃক্ততা রয়েছে—তা তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, হত্যা মামলার মতো গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত আসামিদের মুক্তি দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের ভুল শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলার প্রশ্নই নয়, বরং এটি জননিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ কারণে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, তদন্ত কমিটি কারাগারের সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, মুক্তির আদেশ সংক্রান্ত কাগজপত্র, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং পুরো প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখবে। একই সঙ্গে আসামিদের মুক্তির পর তাদের অবস্থান এবং পুনরায় গ্রেপ্তারের বিষয়েও প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হতে পারে।
কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্তে যেসব কর্মকর্তা বা কর্মচারীর গাফিলতি বা দায়িত্বহীনতার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আসতে পারে।
এদিকে ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেকেই জানতে চাইছেন, কীভাবে একটি কারাগার থেকে হত্যা মামলার আসামিরা এমন ভুলের মাধ্যমে মুক্তি পেতে পারেন। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কারা ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের ভুল গুরুতর কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
তাঁদের মতে, প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট এবং জামিননামার মতো গুরুত্বপূর্ণ নথির মধ্যে পার্থক্য নিরূপণে একাধিক স্তরের যাচাই-বাছাই থাকা জরুরি। শুধু একজন কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আবারও ঘটতে পারে।