August 25, 2026, 4:43 am

টঙ্গীতে শ্রমিকনেতা শহিদুল ইসলাম হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র আদালতে জমা দিয়েছে পুলিশ

Reporter Name
  • আপডেট Monday, February 26, 2024
  • 146 জন দেখেছে

স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর :: গাজীপুরের টঙ্গীতে আলোচিত শ্রমিকনেতা শহিদুল ইসলাম হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ। হত্যার আট মাস পর শনিবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) রাত ৮টায় ১৪ জনকে আসামি করে অনলাইনে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
অভিযোগপত্রে প্রিন্স জ্যাকার্ড সোয়েটার লিমিটেডের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপক (অ্যাডমিন ম্যানেজার) আবু সালেহ ও স্থানীয় প্রভাবশালী আমির হোসেনের নাম রয়েছে। এই দুই জনের ইশারাতেই শহিদুলকে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশ অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছে। গাজীপুর শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অ্যাডিশনাল এসপি) ও মামলার তদন্ত কমিটির প্রধান ইমরান আহমেদ অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা ১৪ আসামি হলেন- মাজাহারুল ইসলাম (৩৫), আকাশ আহমেদ ওরফে বাবুল (৪৩), রাসেল মন্ডল (৩৫), রাইতুল ইসলাম ওরফে রাতুল (১৯), সোহেল রানা (২৩), জুলহাস আলী (২৩), সোহেল হাসান সোহাগ (২৬), শাহীনুল ইসলাম (২১), শাকিল মোল্লা (২৩), আমির হোসেন (৪০), হালিম মিয়া (৪২), রফিকুল ইসলাম (৪৬), জুয়েল মিয়া (২২) ও আবু সালেহ (৩৯)।
গত বছরের ২৫ জুন টঙ্গীর সাতাইশ বাগানবাড়ী এলাকায় ‘প্রিন্স জ্যাকার্ড সোয়েটার লিমিটেড’ কারখানায় শ্রমিকদের পাওনা টাকা আদায়ে কথা বলতে গিয়ে নিহত হন শহিদুল ইসলাম। সে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের গাজীপুর জেলা শাখার সভাপতি ছিলেন। এ ঘটনায় ২৬ জুন টঙ্গী পশ্চিম থানায় ছয় জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত সাত জনের বিরুদ্ধে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি কল্পনা আক্তার মামলা করেন। প্রাথমিক অবস্থায় মামলার তদন্ত করছিল টঙ্গী পশ্চিম থানা-পুলিশ। পরে ৬ জুলাই মামলার তদন্তভার পায় জেলা শিল্প পুলিশ। আসামি আমির হোসেন টঙ্গীর সাতাইশ এলাকার প্রভাবশালী। তার বিক্রি করা জমিতেই গড়ে উঠেছে প্রিন্স জ্যাকার্ড সোয়েটার কারখানা। সেই হিসেবে আমির হোসেন ওই কারখানায় ঝুট ব্যবসা করতেন।
স্থানীয়রা জানান, হালিম মিয়া আমির হোসেনের ভাই কামরুলের জমি ব্যবসার প্রজেক্ট ইনচার্জ হিসেবে এলাকায় পরিচয় দেন। আবু সালেহ প্রিন্স জ্যাকার্ড সোয়েটার লিমিটেডের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপক (অ্যাডমিন ম্যানেজার)। মাজাহারুল বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের টঙ্গী পশ্চিম থানার সাধারণ সম্পাদক। বাকি আসামিরা কেউ শ্রমিক নেতা, কেউ স্থানীয় বাসিন্দা।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, গত বছরের মে ও জুন মাসের বেতন এবং ঈদ বোনাসকে কেন্দ্র করে ২৫ জুন দুপুর থেকে প্রিন্স জ্যাকার্ড কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়। খবর পেয়ে ওই দিন বিকালে শ্রমিকদের বেতন আদায় করে দিতে কারখানায় যান শহিদুল, মোস্তফা, আক্কাছ ও শরিফ। বেতন ভাতার বিষয়ে কথা বলে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে কারখানা থেকে বের হন শহিদুলসহ তার তিন সহযোগী। এ সময় স্থানীয় প্রভাবশালী আমির হোসেন ও কারখানার প্রশাসনিক ব্যবস্থাপক আবু সালেহর ইশারায় মাজাহারুলরা তাকে হামলা করে মারধর করেন। পরে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে মারা যান।
অভিযোগপত্র ও মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শ্রমিক নেতা শহিদুল ইসলাম বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের বেতনের সমস্যা নিয়ে কাজ করতেন। তার সঙ্গে কাজ করতেন মোস্তফা, আক্কাছ ও শরিফসহ আরও তিন শ্রমিক নেতা। বিভিন্ন কারখানায় কমিটি দেওয়াকে কেন্দ্র করে তাদের সঙ্গে শ্রমিক নেতা মাহাজারুল ও রাসেল মন্ডলদের বিরোধ হয়। শহিদুলের নেতৃত্বে তার সহযোগীরা কাজ করতেন গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানা এবং মাজাহারুলের নেতৃত্বে তার সহযোগীরা কাজ করতেন টঙ্গীর সাতাইশ এলাকার বিভিন্ন কারখানায়। ঘটনার দিন ২৫ জুন শহিদুল ও তার সহযোগীরা হঠাৎ বেতন ভাতার সমস্যা সমাধান করতে টঙ্গীর সাতাইশের প্রিন্স জ্যাকার্ড কারখানায় ঢুকে পড়েন। বিষয়টি ভালোভাবে নেননি মাজাহারুল ও তার লোকজন।মামলার বাদী কল্পনা আক্তার বলেন, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপক জড়িত থাকলে কারখানার মালিক জড়িত থাকে না কীভাবে? আসামি আমির হোসেন ও হালিম মিয়া প্রভাবশালী জমি ব্যবসায়ী কামরুলের লোক। কামরুলের নির্দেশেই তারা কাজ করতো। কিন্তু অভিযোগপত্রে কামরুল বা কারখানার মালিকের নাম নেই। আমরা এ বিষয়ে আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবো।
শহিদুলের স্ত্রী বলেন, আমার স্বামী কারখানায় গিয়েছিলেন শ্রমিকদের দাবি ও পাওনা আদায়ে মালিকপক্ষের লোকজনের সঙ্গে কথা বলার জন্য। সেখানে তার কোনও শত্রু নেই। কারখানা মালিকের একজন লোক রয়েছে যার নাম হানিফ। তিনি নিজে ঘটনাস্থলে থেকে তার স্বামী শহিদুলকে হত্যা করিয়েছে। পরে পুলিশ হালিম নামে একজন বয়স্ক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে। তাহলে যেই হানিফ আমার স্বামীকে হত্যা করিয়েছে সেই হানিফ কোথায় গেলো? আমার কাছে এ প্রশ্নগুলো শুধু ঘুরপাক খায়।
তিনি বলেন, আমি জীবনে আর আমার স্বামী পাবো না, আমার বাচ্চারা আর তাদের বাবা পাবে না। আমার স্বামীকে কারা মারছে, কেন মারছে, কার ইন্ধনে মারছে? আমার স্বামীকে ইন্ধন ছাড়া মারেনি। আমি চাই সঠিক তদন্ত হোক। নামের সঙ্গে মিল তৈরি করে প্রকৃত আসামিকে যেন লুকানোর চেষ্টা করা না হয়।
নিহত শহিদুল ইসলামের ছেলে উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষের ছাত্র সাদিকুল ইসলাম অপূর্ব জানান, তার বাবার প্রকৃত হত্যাকারীরা যেন আইনের ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে। তাদের যেন সুষ্ঠু বিচার ও সঠিক দণ্ড হয়।
মামলার তদন্ত কমিটির সভাপতি ও গাজীপুর শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অ্যাডিশনাল এসপি) ইমরান আহমেদ বলেন, মামলাটি বিভিন্ন কারণে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ছিল। তদন্ত ও সাক্ষ্য প্রমাণে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী আমির হোসেন ও কারখানার কর্মকর্তা আবু সালেহর নাম উঠে এসেছে। মূলত তাদের ইশারা-ইঙ্গিতেই অন্য আসামিরা শহিদুলের ওপর হামলা চালিয়েছে। সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করেই অভিযোগপত্র দায়ের করেছি।

সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই সম্পর্কিত আরও খবর