মো: মুর্শিকুল আলম:: গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের এক প্রবাসফেরত আফজাল শেখ। তিনি মালয়েশিয়ায় রং মিস্ত্রির কাজ করতেন। কিন্তু বিদেশে তেমন ভালো কিছু করতে পারছিলেন না। এক পর্যায়ে দেশে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। মালয়েশিয়ায় থাকা অবস্থায় ইউটিউবে রাম্বুটান চাষ কিভাবে করতে হয় সেই ভিডিও দেখে তার আগ্রহ জন্মায়। এরপর তিনি মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় জনপ্রিয় এ ফলের চাষের পদ্ধতি বিষয়ে জানতে শুরু করেন। ২০১৮ সালের শেষদিকে আফজাল দেশে ফিরে আসেন। ফেরার সময় চারটি রাম্বুটানের চারা সাথে করে নিয়ে আসেন। পরে বাড়ির উঠানে রাম্বুটানের সেই চারটি চারা গাছ রোপণ করেন। একটি গাছ মারা যায়, বাকি ৩টি চারা টিকে যায়। দেশে ফিরে আফজাল জীবিকা নির্বাহের জন্য আবারও রং মিস্ত্রির কাজ শুরু করেন। কাজের ফাকে গাছগুলোর সেবা যত্ন নিতে থাকেন। কয়েক বছর পরেই ফলন দিতে শুরু করে। প্রথম কয়েক বছর আশানুরূপ না হলেও হাল ছাড়েননি আফজাল। যোগাযোগ করেন স্থানীয় কৃষি অফিস ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে। কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়ে শুরু করেন পরিচর্যা। এর ফলও পেতে শুরু করেন আফজাল শেখ। এ বছর তার বাড়ির তিনটি রাম্বুটান গাছে বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রতিদিনই পাইকার ও খুচরা ক্রেতারা ভিড় করছেন তার বাড়িতে।
প্রতি কেজি রাম্বুটান ১২শ’ থেকে ১৫শ’ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। শুধু ফল বিক্রিই নয়; চারা বিক্রি করেও আয় করছেন আফজাল শেখ। অনেক আগ্রহী কৃষক তার কাছ থেকে চারা সংগ্রহ করে রাম্বুটান চাষ করছেন। এখন আফজাল শেখ শুধু একসময়ের প্রবাসী বা রং মিস্ত্রি নন; একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।
এই ফলটি দেখতে অনেকটা লিচুর মতো হলেও রাম্বুটানের লোমশ খোসা আর ভিন্ন স্বাদ আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, স্বপ্ন, সাহস আর সাধনার এক অনন্য উদাহরণ আফজাল শেখ। নিজের জীবন থেকে পাওয়া শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন সমাজে।
এ বিষয়ে আফজাল শেখ বলেন, পরিকল্পনা, ধৈর্য, নিয়মিত পরিচর্যা আর পরিশ্রমকে ভিত্তি করেই আমি আজ এ অবস্থানে এসেছি। প্রথমে শুধুই শখ ছিল। ভাবিনি একদিন এটাই হবে আমার আয়ের বড় উৎস। রাম্বুটানের পাশাপাশি মালয়েশিয়ান ডুরিয়ান, আফ্রিকান ননিফলসহ বেশ কয়েক ধরনের বিদেশি ফলের গাছও লাগিয়েছি। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে চাষের ইচ্ছা আছে।
আফজাল শেখ বলেন, শুধু নিজের ভাগ্য বদলানোর জন্য নয়, এলাকার তরুণ-যুবকদের কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছি। রাম্বুটান চারা তৈরির পাশাপাশি বেকার তরুণদের এ ফল চাষে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। আমি চাই দেশের আরও জায়গায় রাম্বুটান চাষ ছড়িয়ে পড়ুক। এটি শুধু লাভজনক নয় বরং কৃষির প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে সহায়ক হবে। তরুণরা যদি এ খাতে আসেন, তাহলে বেকারত্ব অনেকটাই কমে আসবে।
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ ফারজানা তাসলিম বলেন, বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু রাম্বুটান চাষের জন্য বেশ উপযোগী। যারা আগ্রহী, তাদের প্রশিক্ষণসহ সব ধরনের সহায়তা দিতে আমরা প্রস্তুত। আফজাল শেখের মতো প্রবাসফেরত তরুণরা যদি এ ধরনের উদ্যোগে এগিয়ে আসেন, তাহলে কৃষিতে নতুন বিপ্লব ঘটবে। এটি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; দেশের অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।