এস.এম বিজয় চৌধুরী, স্টাফ রিপোর্টার, উত্তরা :: রাজধানীর উত্তরা যেন এখন ব্যাটারিচালিত রিকশার দখলে। সন্ধ্যার পর থেকে রাত যত গভীর হয় ততই বাড়ে এসব রিকশার দাপট। দিনদিন উত্তরার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে এ ধরনের রিকশার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর নিয়ন্ত্রণহীন গতিতে চলাচলের ফলে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ঘটছে দুর্ঘটনা।
ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কসহ অন্যান্য সড়কে এসব ব্যাটারিচালিত রিকশা বেপরোয়া গতিতে ছুটে চললেও এর বিরুদ্ধে খুব একটা কার্যকর কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা চোখে পড়ে না। মাঝে মাঝে পুলিশের অভিযান চালানো হলেও তাতে মিলছে না সুফল। বিভিন্ন সময় এসব ব্যাটারিচালিত রিকশাকে বিপজ্জনক উল্লেখ করে চলাচল বন্ধের দাবি উঠলেও তা এখনো বাস্তবে কার্যকর হয়নি। ফলে জনদুর্ভোগ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছেই।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ট্রাফিক ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে সব সড়কে বেড়ে যায় এ যান। রাজধানীর মূল সড়কগুলোতেও দাপিয়ে বেড়ায় ব্যাটারিচালিত রিকশা। বেপরোয়াভাবে চালানোয় এসব রিকশা দুর্ঘটনায় পড়ছে অহরহ। এমন অবস্থায় হাইকোর্ট ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের আদেশ দিলে সড়কে নামেন চালকরা। হাইকোর্ট নিষেধাজ্ঞা দিলেও পরে আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থায় আপাতত ঢাকার রাস্তায় চলার অনুমতি পেয়ে যায় ব্যাটারিচালিত রিকশা। রাজধানীতে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রিকশা চলাচল করছে। এর বড় একটি অংশ ব্যাটারিচালিত।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, নিষিদ্ধ ব্যাটারিচালিত রিকশায় সয়লাব রাজধানী উত্তরার ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়কে। অবৈধ ব্যাটারি চালিত রিকশা চলাচল করতে দেখলেই পুলিশ আটক করলেও বাহনগুলোর চলাচল অব্যাহত রয়েছে। রাজধানীর উত্তরা, জসিমউদ্দিন, রাজলক্ষী, আজমপুর, হাউজবিল্ডিং, আব্দুল্লাহপুর, দিয়াবাড়িসহ কয়েকটি সড়কে রিকশা চলাচল করতে দেখা গেছে। প্যাডেল রিকশায় মোটর ও ব্যাটারি লাগিয়ে চলাচল করছে। এলাকায় মোড় দখল করে নিয়েছে ওই বাহনটি। রাতে অন্যান্য গাড়ির চাপ কমে গেলে ব্যাটারিচালিত এসব গাড়ি নামতে থাকে। চলতে থাকে সকল রুটেই। কোন রুটেই বাধা নেই তাদের যেতে।
উত্তরায় কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ইয়াছিন জানান, দিয়াবাড়ি থেকে মোটরসাইকেল যোগে উত্তরা আজমপুরে পৌঁছলে একটি অটোরিকশা সিগন্যাল না দিয়ে সজোরে এসে আঘাত করে। এতে তার ডান হাত কেটে যায়।
অটোরিকশা চালক সাইফুল জানান, সাধারণ যে তিন চাকার রিকশাগুলো রয়েছে, সেগুলোতেই ব্যাটারি লাগিয়ে অটোরিকশা বানানো হয়। এই রিকশার নিয়ন্ত্রণে যে ব্রেক লাগানো হয়েছে, তার দাম মাত্র ২২ টাকা। এত নিম্নমানের ব্রেক খুব অল্প দিনই কার্যকর থাকে। তারপর দেখা দেয় নানা জটিলতা। ব্রেক ঠিকমতো কাজ না করায় এই অটোরিকশায় দুর্ঘটনাও বেশি ঘটে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৫ হাজার ৫৩৮টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে মোট দুর্ঘটনার ১৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ ঘটে শুধু ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক ও অটোভ্যানের মাধ্যমে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২০০৭ সালে চীন থেকে প্রথম শুরু হয় ব্যাটারিচালিত রিকশার জিনিসপত্র আমদানি। তারপর থেকেই ধীরে ধীরে দেশে গড়ে ওঠে প্রায় একশর বেশি কারখানা। রিকশার জন্য এখন আর ব্যাটারি আমদানি করা হয় না। সব ব্যাটারিই বাংলাদেশে তৈরি হচ্ছে চীনা সরঞ্জাম দিয়ে। এ রিকশার পুরো ব্যবসায় চীনের অংশীদারিত্ব ৮০ ভাগের ওপরে। আর দেশে প্রত্যেক বছর যে পরিমাণ ব্যাটারি তৈরি হয়, তার ৯০ শতাংশই হয় চীনা কোম্পানিগুলোর কারখানায়। ২০০৩ সালের দিকে চীন থেকে পুরোপুরি বাহন হিসেবে ইজিবাইক আসত বাংলাদেশে। কিন্তু ২০১২-১৩ সালের দিকে জিনিসপত্র স্থানীয়ভাবে অ্যাসেম্বল করা শুরু হয়।
এ বিষয়ে ট্রাফিক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার ফজলুল করিম বলেন, ডিএমপি পুলিশ কমিশনারের নির্দেশনামতে আমরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ব্যাটারী চালিত অটোরিকশা বা অন্য কোন পায়ে চালিত যান দেখা মাত্রই আমরা ডাম্পিংসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। কয়েকমাস আগে থেকে এ এলাকায় ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ। সেক্টরের ভিতরে দিনের বেলা ও রাতে ব্যাটারিচালিত রিক্সার চলাচলের সংখ্যাও এখন অনেক বেড়ে গেছে। রাতে ১০টা বা সাড়ে ১০টার পরে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ছাড়া অর্থাৎ জনবল সংকট থাকার কারণে যে সকল এলাকায় আমাদের ট্রাফিক পুলিশের ডিউটি থাকে না ঐ সব এলাকায় অটোরিকশার আনাগোনা বেড়ে যায়। এ সকল অটোরিকশা দিনে ও রাতে যেমন যানজট তৈরি করছে আবার তেমনিভাবে সড়ক দুর্ঘটনা কারণ হয়েও দাঁড়িয়েছ। আমাদের ট্রাফিক পুলিশ অটোরিকশাসহ সকল ধরনের অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। অন্যদিকে স্বাভাবিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার স্বার্থে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ ধরণের যানবাহন ব্যবহার না করার জন্য জনসচেতনতা বা জনমত তৈরির কাজও চলমান রেখেছে।