দেওয়ান মোঃ মনিরুজ্জামান, বিশেষ প্রতিবেদক:: গাজীপুর যেন ধীরে ধীরে ‘আতঙ্কের জনপদে’ পরিণত হচ্ছে। মাত্র সাত মাসে মহানগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত হয়েছে ১০৩টি হত্যাকাণ্ড। রাজনীতি, মাদক, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, জমি বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্বসহ নানা কারণে সংঘটিত এসব খুন স্থানীয়দের নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতিকে তীব্রতর করেছে। অপরাধীদের দাপট গাজীপুর চৌরাস্তা, চান্দনা, টঙ্গী, বাসনসহ নগরীর বেশ কিছু স্থানে স্থায়ী আস্তানা গড়ে তুললেও দৃশ্যমান প্রতিকার এখনো চোখে পড়ছে না।
ধারাবাহিক সহিংসতা ও সাম্প্রতিক নৃশংসতা:
গত বৃহস্পতিবার রাতে চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় সাংবাদিক মো. আসাদুজ্জামান তুহিনকে। আগের দিন বিকেলে সাহাপাড়া এলাকায় আরেক সাংবাদিক আনোয়ার হোসেনকে টেনে-হিঁচড়ে পিটিয়ে ও ইট দিয়ে আঘাত করে গুরুতর আহত করা হয়। তিনি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই শুক্রবার সকালে টঙ্গী স্টেশন রোডে একটি ব্যাগের ভেতর থেকে উদ্ধার হয় এক যুবকের খণ্ডিত মরদেহ। সম্প্রতি টঙ্গী ও আশপাশ এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে; এমনকি চাপাতি হাতে হামলার ভিডিওও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
পারিবারিক দ্বন্দ্ব থেকে রক্তপাত:
গত শনিবার রাতে শ্বাসরোধ ও পিটিয়ে হত্যার পর স্ত্রী মারুফা আক্তারের লাশ ঘরে রেখে বাইরে আগুন ধরিয়ে দেন স্বামী মিজানুর রহমান। তিন বছর আগে প্রথম স্বামীকে ছেড়ে পল্লিচিকিৎসক মিজানুরকে বিয়ে করেছিলেন মারুফা। পুলিশের মতে, পারিবারিক কলহই এই হত্যার কারণ। এর আগে বুধবার রাতে শ্রীপুর উপজেলার মধ্যপাড়া গ্রামে স্বামী নূরুল ইসলাম পিটিয়ে হত্যা করেন স্ত্রী সুইটি আক্তারকে। এ ঘটনার পর ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী বৃহস্পতিবার সকালে নূরুল ইসলামের দুটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
লাশ উদ্ধার ও অজ্ঞাত খুন:
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান ও অন্যান্য নির্জন স্থানে প্রায়ই লাশ পাওয়া যাচ্ছে। খুনিরা এসব স্থানকে নিরাপদ ভেবে মরদেহ ফেলে যায়। অনেক সময় পরিচয়হীন লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।
পুলিশের তথ্য:
গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার চৌধুরী মো. যাবের সাদেক জানিয়েছেন, গত সাত মাসে জেলার পাঁচ থানায় ৫৯টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৪৮টির রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে এবং ৫২ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বেশিরভাগ খুন জমি বিরোধ ও পারিবারিক সমস্যাজনিত হলেও মাদক ও নারী-সংক্রান্ত ঘটনাও রয়েছে। তাঁর মতে, সামাজিক অবক্ষয় ও মূল্যবোধের অবনতি অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মহানগরের আট থানায় সাত মাসে ৩৫টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সদর থানায় সবচেয়ে বেশি ১১টি খুন হয়েছে। টঙ্গী পূর্ব থানায় ৮টি, টঙ্গী পশ্চিমে ৪টি, কাশিমপুরে ৪টি, কোনাবাড়ীতে ৩টি, বাসনে ৫টি, পুবাইলে ২টি এবং গাছায় ২টি খুনের মামলা হয়েছে।
ছিনতাই ও চাঁদাবাজির বলি সাধারণ মানুষ:
গত ১১ জুলাই রাতে টঙ্গীর সড়ক ও জনপথ কার্যালয়ের সামনে ছিনতাইকারীর হামলায় খুন হন কলেজ শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমান। এর আগে ১৭ মে টঙ্গী ফ্লাইওভারে ছিনতাইকারীর হাতে প্রাণ হারান রঞ্জু নামে এক যুবক। চাঁদাবাজি নিয়েও ঘটেছে ভয়াবহ ঘটনা। কোনাবাড়ীর জরুণ এলাকার প্রবীণ নাসির পালোয়ানের কাছ থেকে কিশোর গ্যাং লিডার ওয়াসিফ সালিম টাকা দাবি করেছিল। গত ২৭ মে রাতে ওয়াসিফের নেতৃত্বে হামলায় নাসিরের মাথার খুলি ১৮ টুকরো করে ফেলা হয়। লাইফ সাপোর্টে থাকার পর ২ জুলাই তাঁর মৃত্যু হয়।
গণপিটুনিতে মৃত্যু:
আইনের বদলে জনরোষের শিকার হয়ে প্রাণ হারানোর ঘটনাও বাড়ছে। ১৮ জুলাই কাপাসিয়ার সেলদিয়া গ্রামে দিনদুপুরে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় নূরুল ইসলামকে। একইভাবে গত ২৭ জুন কোনাবাড়ীতে গার্মেন্টস কারখানার ভেতরে চোর সন্দেহে মেকানিক হৃদয় মিয়াকে হাত-পা বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।