আচ্ছা, সর্বশেষ কবে দেশের কোন প্রধানমন্ত্রী মজলুম জননেতা, মহান স্বাধীনতার প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মাজার জিয়ারত করতে গিয়েছিলেন? কেউ হয়তো স্মরণ করে বলতে পারবেন না। মওলানা ভাসানীর প্রতি একজন সরকার প্রধানের শ্রদ্ধা এবং তাঁর সম্পর্কে, তাঁর রাজনীতি নিয়ে বক্তব্যে যে ইতিবাচক কথাগুলো বলেছেন তা আলোচিত হতে পারতো। প্রশংসিত হতে পারতো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মওলানা ভাসানীর কবর জিয়ারতে ছবি, ভিডিও ভাইরাল হতে পারতো। কিন্তু আমরা কী দেখলাম। ভাইরাল হয়েছে, ‘১৯৭৯ সালের নির্বাচনের আগে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকটি মাওলানা ভাসানী জিয়াউর রহমানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন’ মর্মে দেওয়া বক্তব্য।
এমনকি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রথমবারের মত দেশে কৃষকদের হাতে একটি কার্ড তুলে দেওয়ার যুগান্তকারী পদক্ষেপটিও ছাপা পড়ে গেছে ত্রুটিপূর্ণ বক্তব্যের নিচে।
এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে মওলানা ভাসানী তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের শাসনের মাত্র একটি বছর দেখে যেতে পেরেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি জনতার অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান দেশের হাল ধরের। পরের বছর নভেম্বরের ১৭ তারিখে চির বিদায় নেন মজলুম নেতা। জিয়ার এক বছরের শাসনে মজলুম জননেতা যে সন্তুষ্ট ছিলেন এবং তাঁর নৈতিক সমর্থন ছিলো তা মৃত্যুর আগে এক সাক্ষাৎকারে অকপটে বলে গেছেন। ১৯৭৬ সালে মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে হাসপাতালে জিয়াউর রহমানের শাসন সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন- “এখন পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত দুর্নীতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাঁর মধ্যে স্বজনপ্রীতির লক্ষণও নেই। তাঁর আত্মীয়-স্বজনকে সাধারণ মানুষ চেনে না এবং তিনি তাঁদের কোনো বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেন না। ভারতীয় উপমহাদেশে এ ধরনের শাসককে মানুষ পছন্দ করে। একজন সৎ শাসকের প্রশংসা তো প্রাপ্যই। দেখা যাক, তিনি ভবিষ্যতে জনগণের জন্য কী করেন।”
মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর ইন্তেকাল করেন। সুতরাং, ১৯৭৯ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-এর নিকট ‘ধানের শীষ’ প্রতীক হস্তান্তরের দাবি তথ্যগতভাবে সঠিক নয়। তারেক রহমান ওই বক্তব্যে আরও কিছু কথা বলেছেন। মওলানা ভাসানীর রাজনীতির প্রশংসা করেছেন। জিয়াউর রহমান তাঁর রাজনীতির আদর্শ হিসেবে মওলানার অনেক কিছু গ্রহণ করেছেন- এসব কথাও বলছেন। কিন্তু একটি বাক্য সমালোচনার সুযোগ করে দিল। এ জন্যই শীর্ষ নেতৃত্বকে বক্তব্যের ক্ষেত্রে অধিকতর সতর্ক থাকতে হয়। আশেপাশে যারা পরামর্শক থাকেন তাদেরও অনেক বেশি জানতে হয়, জানাতে হয়।
ইতিহাস বলছে, ১৯৫৭ সালে মওলানা ভাসানী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) প্রতিষ্ঠা করেন। ‘ধানের শীষ’ ছিল দলটির নির্বাচনী প্রতীক। ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ন্যাপ এই প্রতীক নিয়েই অংশগ্রহণ করে এবং সে সময় এটি দলটির সুপ্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত ছিল।
১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে শহীদ জিয়াউর রহমান ‘জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল’ (জাগদল) নামে একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের উদ্যোগ নেন। যদিও প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি নেপথ্যেই ছিলেন, তবুও জাগদল রাজনৈতিক অঙ্গনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি এবং প্রত্যাশিত সাড়া জাগাতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে, ১৯৭৮ সালের ১ মে তাঁকে চেয়ারম্যান করে ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’ গঠিত হয়। একই বছরের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনায় এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এর আগে, ১৯৭৮ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তাঁর সরকারে ন্যাপ নেতা মশিউর রহমান (যাদু মিয়া) ‘সিনিয়র মিনিস্টার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় ন্যাপের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতা বিএনপিতে যোগ দেন। যাদু মিয়াদের উদ্যাগেই ‘ধানের শীষ’ প্রতীকটি বিএনপির প্রতীক হয়। একইভাবে, ঢাকার ৮০/নয়াপল্টনে অবস্থিত ন্যাপের কার্যালয়টিও বর্তমানে বিএনপির নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং এখনও রয়েছে।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দল গঠন, প্রতীক নির্ধারণের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে মওলানা ভাসানীর কোনো প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল না। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় জিয়াউর রহমানকে একজন সৎ, দেশপ্রেমিক ও দুর্নীতিমুক্ত শাসক (সেনা শাসক) হিসেবে মূল্যায়ন করেছিলেন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তাঁকে নৈতিক সমর্থন প্রদান করেছিলেন।
পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা কিন্তু ফাউল টকে চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। মিথ্যার বেসাতি ছিল শেখ হাসিনার বক্তব্যের প্রধান উপজীব্য। অবলীলায় ইতিহাস বিকৃত করতেন। কিন্তু তখন তাঁর বক্তব্যের সমালোচনা করা ছিলো মহাপাপ। ট্রল করাতো দূরে থাক, আমাদের মতো গুটিকয়েক বেকুব ও দুঃসাহসী ছাড়া সবাই মুক ও বধিরত্ব গ্রহণ করেছিলেন। বাস্তবতা হচ্ছে এখন সবাই স্বাধীন। অতিশয় স্বাধীন। অতএব কথা বলতে হবে মেপে মেপে। সত্যনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর। নইলে, নিমিষেই ভালো কাজ-বক্তব্য-অর্জন হারিয়ে যাবে ভুলের গহব্বরে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ধানের শীষ সংক্রান্ত যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে ভুল তথ্যটি শেখ হাসিনার মতো ইচ্ছাকৃতভাবে বলে মনে হয়নি। এমন ভুল হতেই পারে। অন্য রাজনৈতিক নেতাদেরও হয়। আমরা কেউ ভুলের উর্ধ্বে নই। পরের বক্তব্যে ভুলটি তিনি নিজেই স্বীকার করে শুধরে ফেললে পারতেন । আবার কিছু নির্বোধ এআই প্রযুক্তি দিয়ে জিয়াউর রহমানের হাতে মওলানা ভাসানীর এক গুচ্ছ ধানের শীষ তুলে দেওয়ার ছবি তৈরি করে৷ ফেসবুকে পোস্ট করে ডিফেন্ড করার চেষ্টা করছেন, যা আরও গর্হিত ও হাস্যকর কাজ। এম আবদুল্লাহ, যুগ্ম সম্পাদক, দৈনিক আমার দেশ।