April 21, 2026, 7:02 am

বাংলাদেশের পিভিসি ও প্লাস্টিক শিল্পে টিকে থাকার লড়াই, বেকারত্ব বাড়ার আশঙ্কা!

Reporter Name
  • আপডেট Saturday, April 4, 2026
  • 45 জন দেখেছে

দেওয়ান মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, বিশেষ প্রতিবেদক:: ইরান–আমেরিকা–ইসরায়েল সংঘাতের জেরে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত সামুদ্রিক রুট হরমুজ প্রণালী-এ জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে। বিশ্বের জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যাল সরবরাহের অন্যতম প্রধান এই পথটিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় আন্তর্জাতিক শিপিং খরচ, বীমা প্রিমিয়াম এবং ট্রানজিট সময় একযোগে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের পিভিসি ও প্লাস্টিক শিল্পে, যা ইতোমধ্যেই বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে কাঁচামালবাহী জাহাজের চলাচল ব্যাহত হওয়ায় প্লাস্টিক রেজিনের সরবরাহ দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যে রেজিন আগে প্রতি টন ৯০০ থেকে ৯৫০ ডলারে পাওয়া যেত, তা এখন বেড়ে ১,৫০০ থেকে ১,৬০০ ডলারে পৌঁছেছে। কাঁচামালের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয়কে ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে এবং অনেক কারখানা তাদের মজুত দিয়ে মাত্র কয়েক সপ্তাহ চলতে পারবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের প্লাস্টিক শিল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অত্যন্ত বড়। ২০২৬ সালে প্রকাশিত The Daily Star-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্লাস্টিক খাতের অভ্যন্তরীণ বাজারের আকার বছরে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা এবং মোট বিনিয়োগ ৫০–৬০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে। একই সঙ্গে এই খাতে পাঁচ থেকে ছয় হাজারের বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সক্রিয় এবং প্রায় ১২ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান নির্ভর করছে এই শিল্পের ওপর। এই বৃহৎ শিল্প এখন সরাসরি ঝুঁকির মুখে। কাঁচামাল আমদানির অনিশ্চয়তা, ডলার সংকট এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। নতুন অর্ডার গ্রহণে অনীহা তৈরি হয়েছে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন। শিল্প মালিকদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন আরও কমে যাবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিল্পে এই সংকটের সরাসরি প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে শ্রমবাজারে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় নতুন নিয়োগ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, সংকট অব্যাহত থাকলে লক্ষাধিক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়তে পারেন, যা দেশের সামগ্রিক বেকারত্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
পিভিসি ও প্লাস্টিক পণ্য নির্মাণ খাতের একটি প্রধান উপাদান হওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে রিয়েল এস্টেট খাতেও। পাইপ, ফিটিংস, কেবল কভারসহ বিভিন্ন নির্মাণ উপকরণের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় নির্মাণ ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে নতুন প্রকল্প গ্রহণে উদ্যোক্তারা সতর্ক হয়ে পড়েছেন। REHAB সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইতোমধ্যেই অনেক প্রকল্পের কাজ ধীরগতিতে চলছে এবং বাজারে ক্রেতাদের আগ্রহ কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্থবিরতা বা ধসের ঝুঁকি তৈরি করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, হরমুজ প্রণালীকেন্দ্রিক এই সংকট কেবল একটি শিল্পখাতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি করছে। জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন—সব মিলিয়ে দেশের সামগ্রিক উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং এর প্রভাব ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে শিল্প টিকিয়ে রাখতে দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, প্লাস্টিক ও পিভিসি শিল্পের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট সাময়িকভাবে হ্রাস, স্বল্পসুদে ঋণ সুবিধা এবং জ্বালানি খাতে ভর্তুকি প্রদান জরুরি হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বিকল্প কাঁচামাল উৎস খোঁজা এবং স্থানীয় পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পিভিসি ও প্লাস্টিক শিল্প এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। সময়োপযোগী ও কার্যকর নীতি সহায়তা ছাড়া এই সংকট শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং রিয়েল এস্টেট খাত—সবকিছুর ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই সম্পর্কিত আরও খবর