মো: মুর্শিকুল আলম, গাজীপুর :: গাজীপুর মহানগরের চাপুলিয়া এলাকায় দোতলা ভবনের ছাদে ছাগল, মুরগী ও কবুতর লালন-পালন করে সফল ও স্বাবলম্বী হয়েছেন মোর্শেদ খান সুজন। বিদেশ ফেরৎ বেকার সুজন নিজের পরিবারের ডিম-মাংসের চাহিদাপূরণের পাশাপাশি অর্থের অভাব পূরণেও সফল হয়েছেন। ছাদে ছাগল পালনে সফলতা অর্জনে তিনি একজন সফল উদ্যোক্তার উদাহরণ এখন। মোর্শেদ খান সুজন বলেন, অর্থের অভাবে তিনি বেশি লেখা পড়া করতে পারেননি। মানসিক ভারসাম্যহীন বাবা মো. মোশারফ হোসেন দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইজড হয়ে শয্যাশায়ী। সুজন তার দুই ভাই, দুই বোনের মধ্যে সবার বড়। ১৯৯৯ সালে এইচএসসি পাশের পর তাকেই ধরতে হয় সংসারের হাল। তাদের সংসারে দেখা দেয় অর্থ সংকট। অস্বচ্ছলতা দূর করতে কি করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না তিনি। শেষে আত্মীয়-স্বজনদের সহযোগিতায় সৌদি আরবের আবুধাবীতে চলে যান। সেখানে ছোট-খাট কাজ করতে করতে একসময় সেখানে আবু নাসের জেনারেল ট্রান্সপার্ট নামের তেল কোম্পানীতে চাকুরি নেন। দীর্ঘদিন সেখানে চাকুরি করে ২০২১ সালে দেশে চলে আসেন। পরে তার নিকটাত্মীয় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. মোশারফ হোসেনের পরামর্শে আর সৌদিআরবে যাননি। তারপরও নিজের ভাই-বোনদের দেখভাল করা ছাড়া নিজের স্ত্রী ও তিন সন্তানদের ভরণপোষনের দায়িত্ব তাকেই নিতে হয়। সুজন আরো বলেন, বিদেশ থেকে যে টাকা নিয়ে এসেছেন তা দিয়ে চাপুলিয়া এলাকায় কেনা এক খন্ড জমির উপর দোতলা বাড়িটি নির্মাণ করেন। এছাড়া ছোট এক ভাইকেও স্ব-স্ত্রীক ফ্রান্সে পাঠিয়েছি। অন্যভাই বোনদের লেখা-পড়া করিয়ে বিয়ে দিয়েছি। এসব করতে গিয়ে তার জমানো টাকা প্রায় খরচ হয়ে যায়। পরে আবার তিনি বেকার হয়ে পড়েন। বেকারত্ব ঘুচাতে আবার কিছু করার চিন্তা করতে থাকেন। ইউটিউবে ছাগল-মুরগী পালনের সফলতার দৃশ্য দেখে নিজেও ছাগলের খামার করার স্বপ্ন দেখেন সুজন। তার এ স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়। তিনি তার দোতলা ভবনের ছাদে টিনশেড করে খামার নির্মাণ করেন। পরে অনলাইনেই উত্তরার এক ব্যবসায়ির কাছ থেকে ৮০হাজার টাকায় ভারতের হরিয়ানা জাতের ৭মাস বয়সী পুরুষ (পাঠা) বাচ্চা এবং ৯৬হাজার টাকা দুইটি ছোট বাচ্চাসহ মাদী ছাগল ক্রয় করেন। তারপরে তাকে আর পিছু ফিরতে হয়নি। তারপর এক এক করে তার ছাগলের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে অর্ধশতাধিক হয়। কিন্তু সেখানে স্থান সংকুলান না হওয়ায় তিনি বেশ কিছু ছাগল বিক্রি করে দেন। এখনও তার খামারে ৩৫টির মতো ছোট বড় ছাগল রয়েছে। প্রতিটি ছাগল বছরে দুইবার বাচ্চা দেয়। এ ছাগল প্রতিবারে দুইটি/তিনটি করে বাচ্চা দেয়। তার ভবনের দোতলার এক ইউনিট তিনি পরিবার নিয়ে বসবাস করেন আর নিচতলাসহ বাকি ইউনিট ভাড়া দিয়েছেন। সেখানে ভাড়াটিয়ারা বসবাস করছেন। দোতলায় ছাগল পালন করলেও ভাড়াটিয়াদের কিংবা এলাকাবাসীরও কোন অভিযোগ পাইনি। কারণ ছাদে খামার থাকায় নিচের দিকে কোন দূর্গন্ধ যায় না। খামারের বর্জ্য ছাদ থেকে পাইপের মাধ্যমে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়। ফলে দুর্গন্ধ বাইরে ছড়ায় না। ছাগল ছাড়াও তিনি পাশাপাশি কবুতর ও মুরগীর খামার করেছেন একই ছাদে। বর্তমানে তার ২০ জোড়া (লাহরী ও ম্যাক্সি রেসার) কবুতর এবং ৩শতাধিক দেশি মুরগীও রয়েছে। তার ডিম থেকে বাচ্চা ফুটানোর একটি ইনকিউবেটরও রয়েছে। এর সাহায্যে প্রতিদিন তিনি মুরগীর ডিম থেকে ৫০টি করে বাচ্চা ফোটান। পরে বিভিন্ন বয়সী মুরগীর বাচ্চা বা মুরগী বিক্রি করে দেন। সুজন জানান, খমার পরিচালানার জন্য তার খরচও কম। এসব দেখভালের জন্য মাসিক আট হাজার টাকায় এক নারী কর্মী নিয়েছেন। আর খাবারের জন্য তার মাসে ৬/৭হাজার ঠাকা খরচ হয়। এ খামার শুরুর পর থেকে পারিবারের জন্য তাদের মাংস ও ডিম বাজার থেকে আর কিনতে হয়না। তার পারিবাকি প্রয়োজনে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও ঈদে তাদের খামারের ছাগল-মুরগী-ডিম-কবুতর থেকেই প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটান। বর্তমানে ছাগলের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি বর্তমানে তার দোতলা ভবনের বাড়িটি তিন তলা করে খামার বাড়ানোর চিন্তা করছেন। ইতোমধ্যে ভবন নির্মাণ কাজও শুরু করেছেন। তাই তিনি কিছু ছাগল/মুরগী/কবুতর বিক্রি করার পরিকল্পনা নিয়েছেন। অনলাইনে এসব পাখি-প্রাণি বিক্রিয়ের বিজ্ঞাপনও দিয়েছেন। সুজন জানান, ছাগলের খাবারের যোগান দিতে তার বভনের পাশেই জমিতে ঘাস চাষ করেছেন। এছাড়া কুড়া-ভুষি-ছোলাসহ প্রয়োজনীয় খাবার বাজার থেকে ক্রয় করে প্রক্রিয়াজাত করে সরবরাহ করি। কবতুর-মুরগিকেও আমার তৈরি অর্গানিক ফুড সরবরাহ করি। এতে ব্রয়লার মুরগীর মতো মাংসে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়না। ফলে এসব ছাগল-মুরগী-কবুতরের রোগবাইল নেই বললেই চলে এবং ক্রেতাদের চাহিদাও বেশি। স্থানীয় প্রাণি সম্পদ অফিসের সহায়তায় এদের নিয়মিত ভ্যাকসিন প্রয়োগ করি। গাজীপুর জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা মো. ওকিল উদ্দিন জানান, ছাদে ছাগল-মুরগীর খামার নির্মাণ করার একটা পজেটিভ দিক হলো সেখানে রোগ বালাই কম হয়। পড়ে থাকা ছাদটিও কাজে ব্যবহার হলো। তিনি সুজনের খামার সম্পর্কে বলেন, আমরা ওই খামারের নিয়মিত খোজ নিচ্ছি এবং প্রয়োজনে ভ্যাকসিন সরবরাহও করছি। ছাদে খামার স্থাপন করে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটানো সুজনের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এব্যাপারে তার আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন হলে আমরা ব্যবস্থা করবো।