March 2, 2024, 11:29 pm

কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদে মিলল ২৩ বস্তা টাকা!

Reporter Name
  • আপডেট Saturday, August 19, 2023
  • 25 জন দেখেছে

নিজস্ব প্রতিবেদক, কিশোরগঞ্জ :: ১০৪ দিন পর আজ শনিবার আবারও খোলা হলো কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের দানবাক্স। এবার মসজিদের আটটি দানবাক্স বা সিন্দুকে পাওয়া গেল ২৩ বস্তা টাকা। এর আগে গত মে মাসের ৬ তারিখে খোলা হয়েছিল সিন্দুক। তখন মিলেছিল ৫ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৮৯টাকা। আর এটি ছিল পাগলা মসজিদের ইতিহাসে দানবাক্সে পাওয়া সর্বোচ্চ পরিমাণ টাকা। জানুয়ারি মাসে পাওয়া যায় ৪ কোটিরও বেশি টাকা। এই মসজিদের দানবাক্স খুললেই পাওয়া যায় কয়েক কোটি টাকা। এ কারণে মসজিদের দানবাক্সে কী পরিমাণ টাকা পাওয়া গেল, তা নিয়ে লোকজনের থাকে অনেক কৌতূহল। তাই গণনা শেষে জানিয়ে দেওয়া হয় টাকার অঙ্ক। তবে স্থানীয়রা অনেকে বলেছেন, স্বচ্ছতার স্বার্থে আয়ের পাশাপাশি মসজিদের টাকা-পয়সা ব্যয়ের হিসাবটাও জনসম্মুখে নিয়মিত প্রকাশ করা উচিত।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এবার তিন মাস ১৪দিন পর দানবাক্সগুলো খোলা হয়েছে। ইদানিং মসজিদে দানের প্রবাহ আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। তাই তারা ধারণা করছেন, এবারও টাকার পরিমাণ পাঁচ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। পাগলা মসজিদের দানবাক্স খোলা উপ-কমিটির আহ্বায়ক অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) কাজী মহুয়া মমতাজ জানিয়েছেন, চলতি বছরের মে মাসের আগে ৭ জানুয়ারি খোলা হয়েছিল সিন্দুক। তখন পাওয়া যায় ৪ কোটি ১৮লাখ ১৬হাজার ৭৪৪টাকা। এর আগে গত বছরের ১ অক্টোবর খোলা হয় সিন্দুক। সেদিন পাওয়া যায় তিন কোটি ৮৯লাখ ৭০হাজার ৮৮২টাকা। গত ২ জুলাই বৈদেশিক মূদ্রা ও স্বর্ণালঙ্কার বাদে পাওয়া যায় তিন কোটি ৬০ লাখ ২৭ হাজার ৪১৫টাকা। তারও আগে গত বছরের মার্চে পাওয়া যায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ ৫৩ হাজার টাকা।
আজ শনিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কঠোর নিরাপত্তায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ ও পু‌লিশ সুপার মোহাম্মদ রা‌সেল শে‌খের উপ‌স্থি‌তি‌তে বেশ কয়েকজন নির্বাহী ম্যাজিস্টেটের তত্ত্বাবধানে খোলা হয় মসজিদের সব সিন্দুক। এরপর টাকাগুলো বস্তাবন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয় দোতলায়। টাকাগুলো ভরতে ২৩টি বস্তার প্রয়োজন হয়।

স্থানীয়রা জানায়, মুসলমানসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকজন এ মসজিদে দান করেন। এখানে দান করলে মনোবাসনা পূরণ হয়- এমন বিশ্বাস থেকে তারা ছুটে আসেন পাগলা মসজিদে। দান করেন মোটা অঙ্কের টাকা। তবে এ মসজিদের দানবাক্সে যে বিপুল পরিমাণ টাকা পাওয়া যায়, তা জেলার আর কোনো মসজিদে মিলে না। টাকার সঙ্গে সোনা-রূপার অলঙ্কারসহ থাকে বিদেশি মূদ্রাও। তাছাড়া প্রতিদিন বিপুল সংখ্যাক গোবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, ফলফলাদি, মোমবাতি ও ধর্মীয় বই দান করে লোকজন। আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় দানবাক্সে পাওয়া চিঠিপত্র। এসব চিঠিতে লোকজন তাদের জীবনে পাওয়ার আনন্দ, না-পাওয়ার বেদনা, আয়-উন্নতির ফরিয়াদ, চাকরির প্রত্যাশা, পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের আশা ও রোগব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে আকুতি প্রকাশ করেন। এমনকি শত্রুকে ঘায়েলের দাবিও থাকে কোনো কোনো চিঠিতে।

সকালে দানবাক্স বা সিন্দুক খোলার সময় মসজিদে নেওয়া হয় বাড়তি নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা। জেলা প্রশাসনের বেশ কয়েকজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ ও আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বড়সড় দল টাকা-পয়সা গণনা ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করে। সকালে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, সিন্দুকের টাকা-পয়সা বস্তাবন্দি করছে দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকজন। পরে বস্তাগুলো ধরাধরি করে মসজিদের দ্বিতীয় তলায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অপেক্ষমান গণনাকারীদের সামনে ঢেলে দেওয়া হয় টাকাগুলো। এভাবেই শুরু হয় গণনার কাজ।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ( রাজস্ব) এটিএম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, পাগলা মসজিদের টাকা জমা হয় রূপালী ব্যাংকে। তাই এই ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারি, মসজিদের কর্মচারি ও কমিটির লোকজন, মাদরাসার ছাত্রসহ সবমিলিয়ে প্রায় দু-শাতাধিক লোক সারাদিন টাকাগুলো গুনবে। মসজিদ পরিচালনা, এর অর্থ-সম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় ২৯সদস্যের একটি কমিটি রয়েছে। এর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন যথাক্রমে জেলা প্রশাসক ও কিশোরগঞ্জ পৌর মেয়র।

জানা গে‌ছে, মসজিদের দানের টাকা ব্যাংকে গচ্ছিত থাকে। আর ওই টাকার লভ্যাংশ থেকে গরিব অসহায় লোকদের আর্থিক সহায়তা, ক্যানসারসহ জটিল রোগে আক্রান্তদের আর্থিকভাবে অনুদান দিয়ে মসজিদটি আর্তমানবতার সেবায় ভূমিকা রাখছে। দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের অনুদান দেওয়া হয় মসজিদের তহবিল থেকে। এইসব সেবামূলক কর্মকাণ্ড সারাবছরই করে থাকে পাগলা মসজিদ।

মসজিদ পরিচালনা ক‌মি‌টি জানায়, কেবল মুসলমান নয়, অন্য ধর্মের লোকজনও পাগলা মসজিদে বিপুল অঙ্কের টাকাপয়সা দান করে। সব সম্প্রদায়ের মানুষ পাগলা মসজিদ পরিদর্শনে আসে। যা প্রকৃতপক্ষে অসাম্প্রদায়িকতার বিরল এক দৃষ্টান্ত।

মসজিদের সভাপতি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ বলেন, দানের টাকায় মসজিদের বড়সড় উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। মসজিদ ঘিরে এখানে আন্তর্জাতিকমানের একটি দৃষ্টিনন্দন বহুতল ইসলামি কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। সমৃদ্ধ লাইব্রেরিসহ থাকবে আরো বিভিন্ন আয়োজন। এ প্রকল্পের জন্য প্রাথমিকভাবে ১১৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ শেষের পথে। এখন সবকিছু গুছিয়ে আনা হচ্ছে। খুব শিগগিরই হয়ত কাজে হাত দিতে পারব আমরা।কিশোরগঞ্জ শহরের পশ্চিমে হারুয়া এলাকায় নরসুন্দা নদীর তীরে মাত্র ১০ শতাংশ ভূমির ওপর এই মসজিদটি গড়ে উঠেছিল। সময়ের সাথে আজ পাগলা মসজিদের পরিধিও বেড়েছে।

সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই সম্পর্কিত আরও খবর