দেওয়ান মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, বিশেষ প্রতিবেদক :: গাজীপুরে প্রকাশ্যে দিনের আলোয় নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে সাংবাদিক মো. আসাদুজ্জামান তুহিনকে। রাজধানীর পাশের বৃহত্তম নগরীগুলোর একটি গাজীপুরে এমন প্রকাশ্য সহিংসতায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহলে।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, চাঁদাবাজি নিয়ে প্রতিবেদন করায় তুহিনকে হত্যা করা হয়েছে। তবে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ভিন্ন তথ্য—ঘটনার সূত্রপাত হয় এক ‘হানি ট্র্যাপ’ থেকে, যা ভিডিও ধারণ করার পরই তিনি খুনের শিকার হন।
নিহত তুহিন দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ-এর গাজীপুর প্রতিনিধি ছিলেন এবং পাশাপাশি একটি ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করতেন। তিনি স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে চান্দনা এলাকার ভাড়া বাসায় থাকতেন। বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) রাতে বাসায় ফেরার পথে ছয়-সাতজন যুবক ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাকে ধাওয়া করে। প্রাণ বাঁচাতে তিনি ঈদগাহ মার্কেটের একটি দোকানে ঢুকে পড়লেও দুর্বৃত্তরা সেখানে ঢুকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। গুরুতর আহত অবস্থাতেই ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হয়।
সেদিন কিছু সময় আগে তুহিন ও সহকর্মী সাংবাদিক শামীম হোসেন চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় ছিলেন। শামীম জানান, তারা হাঁটার সময় এক নারী ও এক পুরুষ তাদের অতিক্রম করে যায়। হঠাৎ কয়েকজন অস্ত্রধারী এসে ওই পুরুষকে লক্ষ্য করে তাড়া দিলে তিনিও দৌড় দেন। তুহিন তখন তাদের ভিডিও ধারণ শুরু করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সশস্ত্র ব্যক্তিরা তাকে ধাওয়া দিয়ে দোকানের ভেতরে ঢুকে হত্যা করে পালিয়ে যায়।
পুলিশের তদন্তে জানা যায়, গোলাপি নামে এক নারী বাদশা মিয়া নামে একজনকে প্রলোভনে ফেলে। পরে ওই নারীর পক্ষ নিয়ে কয়েকজন যুবক ধারালো অস্ত্র দিয়ে বাদশাকে মারধর করে। ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে তুহিন এই দৃশ্য ভিডিও করছিলেন। ভিডিও মুছে ফেলতে বলা হলেও তিনি অস্বীকৃতি জানান। এর পরপরই তাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (ক্রাইম) রবিউল হাসান জানান, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ফয়সাল ওরফে কেটু মিজান, শাহজামাল, বুলেট ও সুজনসহ কয়েকজন হামলায় জড়িত। ইতোমধ্যে পাঁচজন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে, বাকিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পলাতক গোলাপিকে ধরতে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
শুক্রবার (৮ আগস্ট) সকালে নিহতের বড় ভাই মো. সেলিম বাসন থানায় মামলা করেন, যেখানে ২০-২৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। এদিকে, তুহিন হত্যার প্রতিবাদে গাজীপুর প্রেস ক্লাবের সামনে সাংবাদিক ইউনিয়নের উদ্যোগে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। বক্তারা দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
পুলিশ বলছে, তারা সতর্কভাবে তদন্ত করছে যাতে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি মামলায় জড়িয়ে না যায়। গাজীপুরের এই ঘটনাটি এখন জনমনে ক্ষোভ ও আতঙ্কের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।